আপডেট :

মেয়ের কাছে বাবা কখনো চোর হয় না। মেয়ের কাছে বাবারা সব সময় হিরো, রক্ষাকর্তা, সবচেয়ে বড় ভরসার নাম। বরিশালের উজিরপুরের একটি বাজারে যে দৃশ্য আমরা দেখলাম, তা কোনো সাধারণ সংবাদ নয়- তা এই জাতির বিবেকের সামনে খুলে ধরা একটি নির্মম আয়না।
রাস্তার পাশে একটি খুঁটির সঙ্গে বাঁধা এক অসহায় বাবা। তার পাশে বসে কাঁদছে তার নয় বছরের ছোট্ট মেয়ে। চারপাশে জড়ো হওয়া মানুষের ভিড়ের মধ্যে সেই ছোট্ট হাত দুটো পাউরুটি ছিঁড়ে চায়ে ভিজিয়ে তুলে দিচ্ছে বাবার মুখে। শিশুটির চোখে ছিল এক অসহায় আকুতি- লোকজনের দিকে তাকিয়ে যেন সে বলতে চাইছিল, ‘আমার বাবাকে আর মেরো না।’
এই একটি দৃশ্য যেন গোটা একটি সমাজের ব্যর্থতার দলিল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। একটি শিশুর কোমল হাত- যে হাতের কথা ছিল খাতা-কলম ধরার, খেলনা নিয়ে খেলার, বাবার কোলে বসে গল্প শোনার- সেই হাতকেই আজ রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাবার মুক্তির জন্য মানুষের কাছে ভিক্ষা চাইতে হচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে যে মানুষটির চোখ ভেজেনি, বুঝতে হবে তার ভেতরের মানুষটি কোথাও একটা হারিয়ে গেছে।
প্রশ্ন জাগে, বারবার জাগে- একজন সাধারণ মানুষ কেন চুরি করতে যাবে? রাষ্ট্র কি এই বাবাকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে পেরেছে? জুয়া ও মাদকের মতো ভয়ংকর থাবা থেকে তাকে নিরাপদ রাখতে পেরেছে? কোন পরিস্থিতি একজন বাবাকে বাধ্য করে মধ্যরাতে একটি মুদিদোকানে হাত বাড়াতে?
এর উত্তর আমরা সবাই জানি, কিন্তু স্বীকার করতে চাই না। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা, এই সমাজব্যবস্থা আজও প্রতিটি নাগরিককে সমান সুযোগ, সমান মর্যাদা ও সমান নিরাপত্তা দিতে পারেনি।
একদিকে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা প্রকাশ্যে দিবালোকে লুটপাট হয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাবান ও রাজনীতিবিদদের কৌশলে-কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই, কোনো লজ্জা ছাড়াই। অন্যদিকে একজন মানুষ তার পরিবার-পরিজনকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে বাধ্য হচ্ছেন চুরির মতো জঘন্য পথ বেছে নিতে। এই বৈপরীত্য, এই নিষ্ঠুর বৈষম্যই আজ আমাদের সামনে এমন অমানবিক দৃশ্য হয়ে ফিরে আসছে বারবার।
কেউ না খেটে বড়লোক হয়ে যাচ্ছে, কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছে রাতারাতি। আর কেউ সৎ পথে থেকেও, দিনরাত পরিশ্রম করেও নিজের সন্তানের মুখে তিন বেলা খাবার তুলে দিতে পারছে না। এই ব্যবধান যদি না কমে, এই বৈষম্য যদি প্রতিদিন আরও চওড়া হতে থাকে, তাহলে আরও কত বাবাকে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হবে, আরও কত শিশুকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে হবে- তার হিসাব আমরা কেউ জানি না।
তবু এই ঘটনার মধ্যেও একটি আলো আছে, একটি আশার রেখা আছে। স্থানীয় মানুষেরা শেষ পর্যন্ত মানবিক হয়েছেন। প্রতিশ্রুতি নিয়ে তারা ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দিয়েছেন, তাকে আরেকবার সুযোগ দিয়েছেন নতুন করে বাঁচার। ধন্যবাদ জানাই সেই সব মানুষকে, যাঁদের ভেতরের মনুষ্যত্ব এখনও নিভে যায়নি।
এই ঘটনাই প্রমাণ করে, আমাদের সমাজে এখনও করুণা আছে, এখনও ক্ষমা করার সাহস আছে। কিন্তু এই সাহায্যের হাত শুধু একটি ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এই মানবিকতাকে আমাদের ছড়িয়ে দিতে হবে সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি নীতিনির্ধারণে।
আমি নিজেও বাবা, আর আমারও আছে ঠিক এমনই নয় বছর বয়সী একটি মেয়ে। এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আমি নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। বারবার হাত থেমে গেছে কলমের ওপর।
যে মেয়েটি নিজের ছোট্ট হাতে রুটি ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দিচ্ছিল, তার চোখে যে আকুতি ছিল, যে ভয় ছিল, যে ভালোবাসা ছিল- তা কোনো বাবার পক্ষেই ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রতিটি বাবার হৃদয় সেই মুহূর্তে কেঁপে ওঠে, যখন সে ভাবে- যদি সেই জায়গায় আমি থাকতাম, যদি আমার মেয়েকে এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে হতো, তাহলে কেমন লাগত!
তাই সকলের প্রতি একটি বিনীত অনুরোধ- শিশুটির ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি বা পরিচয় প্রকাশ না করি। আজকের এই কৌতূহল, এই ভাইরাল হওয়ার নেশা যেন কালকে সেই শিশুটির জীবনে বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়।
কিন্তু এই লেখাটি শুধু একটি ঘটনার প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য নয়। এই লেখাটি একটি আহ্বান রাষ্ট্রের কাছে, নীতিনির্ধারকদের কাছে, সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষের কাছে। আজ যে বাবাকে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হলো, আগামীকাল হয়তো অন্য কোনো বাবাকে বাঁধা হবে অন্য কোনো খুঁটিতে। এই চক্র থামাতে হলে শুধু একবেলার সহানুভূতি যথেষ্ট নয়; আমাদের প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন। যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে না, খাদ্যনিরাপত্তা দিতে পারে না, জুয়া ও মাদকের হিংস্র থাবা থেকে বাঁচিয়ে ন্যূনতম মর্যাদার জীবন দিতে পারে না। সেই রাষ্ট্র যেন অন্তত তার ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে।
আর যারা রাষ্ট্রের সম্পদ লুটে নিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করছেন, তাদের প্রতি সমাজের প্রশ্ন তোলার সাহস থাকা উচিত; আপনাদের এই সম্পদের ভাগ কোথায়, যখন একজন বাবাকে তার সন্তানের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে চুরি করতে হয়? আমাদের এই সমাজে, এই দেশে আজও হাজারো বিবেকবান মানুষ আছেন, সামর্থ্যবান মানুষ আছেন, যাঁদের হৃদয়ে এখনও মানবতা বেঁচে আছে। তাদের প্রতি আহ্বান- আসুন, আমরা শুধু একবেলার সহানুভূতি দেখিয়ে থেমে না থাকি।
আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ, এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলি, যেখানে দারিদ্র্যকে হাতিয়ার করে কাউকে অপরাধের পথে ঠেলে দেওয়া না হয়। যেখানে প্রতিটি পরিশ্রমী মানুষের ঘামের মূল্য দেওয়া হয়, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের ন্যায্য সুযোগ থাকে সবার জন্য। আসুন, আমরা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে যাই, যাতে কাউকে আর কোনো কারণেই চুরির মতো জঘন্য পথ বেছে নিতে না হয়, আর কোনো নয় বছরের শিশুকে তার বাবাকে বাঁচানোর জন্য রাস্তায় ছুটে আসতে না হয়।
মেয়ের কাছে বাবা কখনো চোর হয় না। মেয়ের কাছে বাবারা সব সময় হিরো।
বাংলাদেশ ও বিশ্বের সকল খবর, ব্রেকিং নিউজ, লাইভ নিউজ, রাজনীতি, বাণিজ্য, খেলা, বিনোদনসহ সকল সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে পড়তে ক্লিক করুন নিউজসেলবিডি ডট কম।
স্বত্ব © ২০২৫-২০২৬ নিউজ সেল
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।