logo
menu
টাইম ম্যাগাজিনের সেই সাহসী তরুণী

টাইম ম্যাগাজিনের সেই সাহসী তরুণী

পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই খবর পেয়ে মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। স্বাধীনতাসংগ্রামের এই মহানায়কের মুক্তির সংবাদে রাইফেল উঁচিয়ে উল্লাস প্রকাশ করছেন এক বাঙালি তরুণী। পাশে দাঁড়ানো আরেক তরুণীর হাতে ফ্রেমে বাঁধানো বঙ্গবন্ধুর একটি সাদাকালো প্রতিকৃতি। ছবির ফ্রেমে ঝুলছে তাজা ফুলের মালা। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জনের পর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। সেই দৃশ্য ধরা পড়ে বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের আলোকচিত্রীর ক্যামেরায়। টাইম ম্যাগাজিনের ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি সংখ্যার ২২ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘বাংলাদেশ: মুজিবস রোড ফ্রম প্রিজন টু পাওয়ার’ শিরোনামের প্রতিবেদনের সঙ্গে ছাপা হয় ছবিটা। ক্যাপশনে লেখা হয় ‘বেঙ্গলি ওমেন সেলিব্রেটিং নিউজ অব মুজিবস রিলিজ’। ছবিটি কোথায় তোলা, টাইম ম্যাগাজিন তা উল্লেখ করেনি। উল্লেখ নেই আলোকচিত্রীর নামও।

বছর তিনেক আগে টাইম ম্যাগাজিনের অনলাইন আর্কাইভে ঢুকে ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি সংখ্যাটা আমি খুঁজে বের করি। যুদ্ধপরবর্তী সময়ের এই বাঙালি নারীর বীরত্বগাথার চিত্র আমার মনে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগায়। কৌতূহলী মন জানতে চায়—কে এই সাহসী তরুণী? কী তাঁর পরিচয়? কোথায় তোলা ছবিটা কিংবা কে তুলেছিলেন এই সাহসিকার আলেখ্য? চেনাজানা অনেকের কাছে এই তরুণীর পরিচয় জানতে চাই; কিন্তু আমার চেনা গণ্ডির কেউ তাঁর পরিচয় বলতে পারেননি। শেষে বাধ্য হয়ে ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিই। তাতেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। পরে এই তরুণীকে খুঁজে পাই কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবে। তাঁকে খুঁজে পাওয়ার গল্পটা কারও কারও কাছে নাটক কিংবা সিনেমার কাহিনির মতো মনে হতে পারে।

স্বাধীনতাসংগ্রামের এই মহানায়কের মুক্তির সংবাদে রাইফেল উঁচিয়ে উল্লাস প্রকাশ করছেন এক বাঙালি তরুণী। পাশে দাঁড়ানো আরেক তরুণীর হাতে ফ্রেমে বাঁধানো বঙ্গবন্ধুর একটি সাদাকালো প্রতিকৃতি। ছবির ফ্রেমে ঝুলছে তাজা ফুলের মালা।
একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করে ১৬ মার্চ ঢাকার রাজপথে বেরিয়ে এসেছিল চারুকলার শিল্পীসমাজ। শিল্পীদের এই নন্দিত মিছিলের সামনে চার তরুণী। ‘স্বা’–‘ধী’–‘ন’–‘তা’—এই চার অক্ষর বুকে ধরে সামনে এগিয়ে চলছেন তাঁরা। এঁদের একজন—সুলতানা কামাল, আরেকজন সাঈদা কামাল; তাঁরা কবি সুফিয়া কামালের কন্যা। অপর দুজনের পরিচয় ও ঐতিহাসিক ওই ছবিটির পটভূমি জানতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের শেষ প্রান্তের বাড়ি সাঁঝের মায়ায় গিয়ে হাজির হই। সুলতানা কামাল জানান, অন্য দুজন হলেন শোভা আর পিনু। শোভা অকালপ্রয়াত। আর পিনু হলেন শিল্পী হাশেম খানের ভাগনি। সুলতানা কামাল অবশ্য শোভা ও পিনুর পুরো নাম মনে করতে পারেননি।


রাইফেল হাতে ফেরদৌসী পিনু [ধানমন্ডি, ঢাকা, ৩ জানুয়ারি ১৯৭২]। আলোকচিত্রী: অজানা
রাইফেল হাতে ফেরদৌসী পিনু [ধানমন্ডি, ঢাকা, ৩ জানুয়ারি ১৯৭২]। আলোকচিত্রী: অজানাছবি: সংগৃহীত
সুলতানা কামালের সঙ্গে আলাপের সূত্র ধরে পিনুর আসল নাম জানতে হাশেম খানের মেয়ে কনক খানকে ফোন করি। কনক খান জানালেন, পিনুর পুরো নাম ফেরদৌসী পিনু। আর তিনি হাশেম খানের ভাগনি নন, শ্যালিকা। কনকই আমাকে পিনুর ফোন নম্বর দেন। গত ১৬ ডিসেম্বর রাত ৯টা ৪৯ মিনিটে আমি পিনুর মোবাইলে কল দিই। কথায় কথায় তিনি জানালেন, মুক্তিযুদ্ধের পরের সালে টাইম ম্যাগাজিনে তাঁর আরেকটা ছবি ছাপা হয়। শুনে আমার রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। এত দিন ধরে যাঁকে খোঁজ করে পাইনি, আজ তাঁর সঙ্গেই ফোনে কথা বলছি। এ যেন মেঘ না চাইতেই মুষলধারে বৃষ্টি! পরদিন সকাল ৯টায় গিয়ে হাজির হই তাঁর লালমাটিয়ার বাসায়। আমার ক্যামেরার সামনে তিনি এক ঘণ্টার বেশি সময় কথা বলেন।

১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর মুক্তির খবর মার্কিন বেতার ভয়েস অব আমেরিকায় প্রচারিত হয়। এ খবর শুনে পিনু গেলেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ১৭ নম্বর পূর্ব রাজাবাজারের বাড়ি মরিচা হাউসে (বর্তমানে মরিচা গার্ডেন)। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির খবর শুনে শত শত লোক এই বাড়ির সামনে হাজির হয়েছে। সিদ্ধান্ত হলো, পরদিন সকালে মরিচা হাউস থেকে আনন্দ মিছিল নিয়ে তাঁরা যাবেন ধানমন্ডি ১৮ নম্বর বাড়িতে, যেখানে ৯ মাসের বেশি সময় ধরে বন্দী আছেন বেগম ফজিলাতুন নেসা মুজিব ও তাঁর পরিবার। বাসায় ফিরে বড় বোন মনোয়ারা বেগমের কাছে একটি লাল শাড়ি চেয়ে নিলেন। সকালে সেই শাড়ি পরলেন।

ফেরদৌসী পিনু [লালমাটিয়া, ঢাকা, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫]
ফেরদৌসী পিনু [লালমাটিয়া, ঢাকা, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫]ছবি: লেখকের সৌজন্যে
কপালে পরলেন একটা বড় লাল টিপ। সমবয়সী মামাতো বোন বাবলিও পরলেন লাল শাড়ি ও লাল টিপ। সকাল ছয়টায় দুজন গেলেন মরিচা হাউসের সামনে। লেবু নামের এক আওয়ামী লীগ কর্মী পিনু ও বাবলিকে র‌্যালির সামনে দাঁড় করালেন। দুজনকে দুটো রাইফেল দিলেন। সঙ্গে তাজা গুলি। র‌্যালিটি পূর্ব রাজাবাজার থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছাল। ওই বাড়ির সামনে লোকে লোকারণ্য। শহরের চারদিক থেকে স্রোতের মতো মানুষ আসছে। লোকজন উল্লাসে ফেটে পড়ছে। শূন্যে খইয়ের মতো গুলি ফুটছে। দেশি-বিদেশি সাংবাদিকেরাও এসে ভিড় জমিয়েছেন। বেগম মুজিব বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেন। বাড়ির সামনে বিশাল জনসমাগমে বক্তব্য দেন শেখ কামাল, তোফায়েল আহমদ, আবদুল কুদ্দুস মাখন ও নূরে আলম সিদ্দিকী।

ক্যামেরা হাতে এক বিদেশি এগিয়ে এলেন পিনুর দিকে। লোকটি বেশ লম্বা, ফরসা; মুখে চাপ দাড়ি। পিনুকে বললেন, ‘ওপরের দিকে গুলি ছোড়ো। আমি তোমার ছবি তুলব।’ পিনু বললেন, ‘গুলি তো শেষ।’
তখন প্রায় ৯টা। রাইফেলের গুলিও শেষ। ক্যামেরা হাতে এক বিদেশি এগিয়ে এলেন পিনুর দিকে। লোকটি বেশ লম্বা, ফরসা; মুখে চাপ দাড়ি। পিনুকে বললেন, ‘ওপরের দিকে গুলি ছোড়ো। আমি তোমার ছবি তুলব।’ পিনু বললেন, ‘গুলি তো শেষ।’ লোকটি বললেন, ‘রাইফেলটিটি উঁচিয়ে ধরো।’ লোকটি বেশ কয়েকটি ছবি তুললেন। শেষে বললেন, ‘একটু স্মাইল চাই।’ কয়েক দিন পর পিনুর বাসায় আসেন তাঁর সেজ ভগ্নিপতি প্রকৌশলী শরীফ আতিকুর রহমান। তাঁর হাতে টাইম ম্যাগাজিন। সবাইকে ডেকে বললেন, পিনুর ছবি টাইম ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছে। ম্যাগাজিনটা তিনি পিনুকে দিলেন। পিনু দেখলেন শেষ ছবিটাই ছাপা হয়েছে টাইম ম্যাগাজিনে।

১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ছবি
১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ছবিছবি: সংগৃহীত
এ ঘটনা বলতে বলতেই পিনু ফিরে গেলেন একটু পেছনের দিকে, ১৯৭১ সালের মার্চের উত্তাল সময়ে। ওই সময় তিনি পড়তেন চারুকলায়, প্রথম বর্ষে। বড় বোন মনোয়ারা বেগমের পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় থেকে লেখাপড়া করতেন। যখন অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হলো, তখন থেকেই স্কুল–কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয় সব বন্ধ। পিনুর বোনের বাসার পাশেই তাঁর মামা প্রকৌশলী দেওয়ান সাদেকের বাসা। তাঁর বাসার পাশের বাড়িটিই মরিচা হাউস। মরিচা হাউসের দোতলায় থাকতেন সাজেদা চৌধুরী। আর নিচতলায় চলত পার্টির কার্যক্রম।

অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতে মামার বাসার সামনের খোলা জায়গায় মামাতো বোন কুইনি ও বাবলির সঙ্গে গল্প করছিলেন পিনু। সাজেদা চৌধুরী বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাঁদের দেখলেন। তিনি পিনুর মামাকে ডেকে বললেন, ‘ভাই, আমরা মেয়েদের গেরিলা ট্রেনিং দিচ্ছি। আপনি ওদের ট্রেনিংয়ে পাঠান।’ পরদিন বিকেলে তাঁরা গেলেন মরিচা হাউসে। খাতায় নাম লেখার পর তাঁদের ট্রেনিং শুরু হয়ে গেল। সাজেদা চৌধুরীর বাড়ির পেছনে একটি বড় মাঠ ছিল। বিকেলে ওই মাঠেই চলত গোপন ট্রেনিং। শুরুতে তাঁদের ডামি রাইফেল দেওয়া হলো। রাইফেল নিয়ে কীভাবে ক্রলিং করতে হয়, প্রথম দিনই তা শেখানো হলো। ট্রেনিংয়ে শেখানো হতো আত্মরক্ষার কৌশল। ১৬ মার্চ বিকেলে চারুকলার শিল্পীরা যে প্রতিবাদী র‌্যালি বের করেন, সেই র‌্যালির সামনের কাতারে ছিলেন পিনু। র‌্যালি শেষ করে সন্ধ্যার আগে আগে তিনি গেলেন মরিচা হাউসে। বাইরের গেট বন্ধ। অনেকক্ষণ কল বেল বাজালেন; কিন্তু বাড়ির ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় এই বাড়ির গেট আর খোলা হয়নি।

পিনু প্রায়ই নিউমার্কেটে যেতেন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ওষুধ কিনতে। নিউমার্কেটে মিলিশিয়াদের বেশ আনাগোনা। লম্বা ও ফরসা পিনু পাকিস্তানি পোশাক পরতেন। ফলে মিলিশিয়ারা তাঁকে পাকিস্তানি ভেবে কিছু বলতেন না।
২৫ মার্চ রাতে বাসায় বসে ছবি আঁকছিলেন পিনু। হঠাৎ প্রচণ্ড গুলির শব্দে তাঁর মনোযোগ ভাঙে। জানালার পর্দা সরিয়ে দেখেন আকাশ মাঝে মাঝেই লাল হয়ে উঠছে। ১৭ মার্চ ঢাকার সব দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় চিত্রশিল্পীদের প্রতিবাদী র‌্যালির যে ছবি ছাপা হয়, তাতে পিনুর চেহারা একদম স্পষ্ট। ফলে তাঁকে ঢাকায় রাখা নিরাপদ নয়। এপ্রিলের প্রথম দিকে বড় ভগ্নিপতি ওলিউর রহমান চৌধুরী সবাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে চলে যান। ফরিদপুরে তিনি শাড়ি পরে থাকতেন; কিন্তু তাঁকে গ্রামের মেয়েদের মতো মনে হতো না। ফলে গ্রামও নিরাপদ মনে হলো না। একদিন তাঁর মেজ ভাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক দানিউল হক ফরিদপুরে গিয়ে হাজির। বললেন, এখানে থাকার চেয়ে ঢাকাই বেশি নিরাপদ।

ফেরদৌসী পিনুর সঙ্গে লেখক [লালমাটিয়া, ঢাকা, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫]
ফেরদৌসী পিনুর সঙ্গে লেখক [লালমাটিয়া, ঢাকা, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫]ছবি: লেখকের সৌজন্যে
ঢাকায় এসে পিনু শুনলেন সুলতানা কামাল ও সাঈদা কামাল আগরতলায়। পিনুও আগরতলায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন মেজ ভগ্নিপতি হাশেম খান বললেন, ‘দেখো, তোমরা সবাই যদি চলে যাও তাহলে কেমনে হবে। দেশেও তো কাজ করার লোক দরকার।’ পিনু বললেন, ‘এখানে থেকে আমি কী করব?’ হাশেম খান বললেন, ‘এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক কাজ করার আছে।’ পিনু বিভিন্ন বাড়ি গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য টাকা ও পোশাক সংগ্রহ করতে লাগলেন। বড় বোন তাঁকে বলতেন, ‘যদি ভুল করে কোনো স্বাধীনতাবিরোধী লোকের বাড়িতে ঢুকে যাও, তখন তোমার কী হবে ভেবে দেখেছ?’ পিনু বলতেন, ‘আমার কোনো ডরভয় কাজ করে না বুবু।’ পিনুর ছোট ভাই সানাউল হক ছিলেন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র। তিনি ভালো উর্দু বলতে পারতেন। ছোট ভাইকে নিয়ে পিনু প্রায়ই নিউমার্কেটে যেতেন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ওষুধ কিনতে। নিউমার্কেটে মিলিশিয়াদের বেশ আনাগোনা। লম্বা ও ফরসা পিনু পাকিস্তানি পোশাক পরতেন। ফলে মিলিশিয়ারা তাঁকে পাকিস্তানি ভেবে কিছু বলতেন না। পিনু যা সংগ্রহ করতে পারতেন, তা পৌঁছে দিতেন হাশেম খানের গোপীবাগের বাসায়। হাশেম খান সেগুলো কোথায় পাঠাতেন, তা পিনু জানতেন না। তবে স্বাধীনতার পরে জেনেছেন, এসব জিনিস তিনি সুরকার আলতাফ মাহমুদের বাসায় পৌঁছে দিতেন।

স্বাধীনতার পর ইংল্যান্ডে পড়তে যান পিনু। আড়াই বছর পর সেখানকার পড়াশোনা তাঁর ভালো লাগল না। দেশে ফিরে আবার ভর্তি হলেন চারুকলায়। পড়াশোনা শেষে যোগ দিলেন উদয়ন স্কুলে। ১৯৮০ সালে যোগদান করলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের শিল্প নির্দেশনা বিভাগে। ২০১০ সালে নেন অবসর। টাইম ম্যাগাজিনের সেই সাহসী তরুণী এখন অনেকটা অন্তরালে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

‘কুটুমবাড়িতে’ ভাসানীর অজানা আখ্যান

‘কুটুমবাড়িতে’ ভাসানীর অজানা আখ্যান


১৯৭১ সালের যুদ্ধদিনে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সার্বক্ষণিক সহচর সাইফুল ইসলাম সম্পর্কে প্রথম জানতে পেরেছিলাম রাশেদ খান মেননের কাছ থেকে। ২০২৩ সালে ওয়ার্কার্স পার্টির তোপখানা রোডের কার্যালয়ে একটি সাক্ষাৎকারের সময় তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সাইফুল ইসলাম মাওলানা ভাসানীর ১৯৭১ সালের ভারত–জীবনের এমন কিছু ঘটনা ও তথ্য জানেন, যা সম্ভবত আর কেউই জানেন না। বিশেষ করে সে সময় মাওলানা ভাসানী গৃহবন্দী ছিলেন কি না? মুজিবনগর সরকারের ভেতর কী কী টানাপোড়েন ছিল? চীনা নেতা মাও সে-তুংয়ের কাছে ভাসানী সাহায্য চেয়েছিলেন কি না? এমনকি মাওলানা ভাসানী কি সত্যিই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, নাকি সেটি কোনো কৌশল ছিল?—এমন প্রশ্নের উত্তর একমাত্র সাইফুল ইসলামই জানেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৭১ সালের বাম রাজনীতির তরুণ তুর্কি রাশেদ খান মেনন ও হায়দার আকবর খান রনোদের প্রধান নেতা ছিলেন মাওলানা ভাসানী। যাঁরা কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি নামের একটি সংগঠনের অধীনে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। যদিও সে সময় সিংহভাগ বাম রাজনীতিবিদ মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে ছিলেন বিভক্ত ও বিভ্রান্ত। কিছু ক্ষেত্রে হঠকারী।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইফুল ইসলামের স্বাধীনতা ভারত ভাসানী গ্রন্থের কাভারের ছবি দেখেই প্রবল আগ্রহ বোধ করছিলাম। পরে প্রথমার নতুন এই বই আমাকে প্রায় এক সপ্তাহ আটকে রেখেছিল। একটা সুপাঠ্য ইতিহাস–আলেখ্য আমাকে নিয়ে গেছে ইতিহাসের সেসব অলিন্দে, যেখানে এর আগে কেউ আলো ফেলেলনি। বলা বাহুল্য যে ১৯৭১ সালে মাওলানা ভাসানী ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। কিন্তু সে সময় তাঁর দল ন্যাপ ছিল ছিন্নভিন্ন, অসংগঠিত ও দুর্বল। আবার রাজনৈতিক মতাদর্শে তিনি ছিলেন চীনের প্রতি অনুরক্ত। যে চীন আবার বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ভারতের বিরুদ্ধে। এই জটিল সমীকরণের নানা বিশ্লেষণ উঠে এসেছে বইটিতে। যে বিষয়টি মুখবন্ধতে তুলে ধরেছেন দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অধ্যাপক চৌধুরী লিখেছেন, ‘এক অংশ (ন্যাপ) তাঁকে পরামর্শ দিয়েছে পারলে পাকিস্তানকে সমর্থন করতে, না পরলে চুপ করে থাকতে। চীনা দূতাবাস থেকেও তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।’ (পৃ. ১০)

সাইফুল ইসলাম মাওলানা ভাসানীর ১৯৭১ সালের ভারত–জীবনের এমন কিছু ঘটনা ও তথ্য জানেন, যা সম্ভবত আর কেউই জানেন না। বিশেষ করে সে সময় মাওলানা ভাসানী গৃহবন্দী ছিলেন কি না? মুজিবনগর সরকারের ভেতর কী কী টানাপোড়েন ছিল? চীনা নেতা মাও সে-তুংয়ের কাছে ভাসানী সাহায্য চেয়েছিলেন কি না?

স্বাধীনতা ভারত ভাসানী
সাইফুল ইসলাম

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: আগস্ট ২০২৪
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
পৃষ্ঠা: ২৪৭
মূল্য: ৫৫০ ৳

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

যুদ্ধদিনে মাওলানা ভাসানী চীন-পাকিস্তান বলয়ের সেই নিরাপদ আশ্রয়ে যাননি। বরং অপারেশন সার্চলাইট শুরুর আধা ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানি সেনারা টাঙ্গাইলে তাঁর বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। এরপর যমুনা নদীতে ভাসতে ভাসতে মাওলানা যখন আসাম সীমান্তে পৌঁছেছেন, তখন প্রথমে ভারত সরকার তাঁকে ঢুকতে দেয়নি। যদিও পরে তিনি আসামে প্রবেশ করেন। এরপর শুরু হয় মাওলানা ভাসানীর ১৯৭১ সালের ভারতপ্রবাস। যাকে মাওলানা নিজেই তুলনা করেছেন কুটুমবাড়িতে বেড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে। যদিও তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও কার্যকরভাবে যুদ্ধে ভূমিকা রাখা। সেই ভূমিকা কেন রাখা সম্ভব হয়নি, কার কারণে সম্ভব হয়নি, সেসবের এক বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন সাইফুল ইসলাম। এ বিশ্লেষণ যুক্তিনির্ভর ও সময়োচিত।

যুদ্ধদিনে মাওলানা ভারতের আসাম, কোচবিহার, দেরাদুন ও কলকাতায় ছিলেন। কিছুদিন দিল্লির হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ভাসানী কিছুটা নিয়ন্ত্রিত ও কিছু ক্ষেত্রে মুক্ত ছিলেন। তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, অসুস্থ মাওলানার চিকিৎসার জন্য ইন্দিরা গান্ধী সরকার আন্তরিকতা দেখিয়েছিল।

১৯৭১ সালের যুদ্ধদিনে মওলানা ভাসানী ভারতে গৃহবন্দী ছিলেন কি না, তার একটি বিস্তারিত বর্ণনা আছে এ বইয়ে। যুদ্ধদিনে মাওলানা ভারতের আসাম, কোচবিহার, দেরাদুন ও কলকাতায় ছিলেন। কিছুদিন দিল্লির হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ভাসানী কিছুটা নিয়ন্ত্রিত ও কিছু ক্ষেত্রে মুক্ত ছিলেন। তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, অসুস্থ মাওলানার চিকিৎসার জন্য ইন্দিরা গান্ধী সরকার আন্তরিকতা দেখিয়েছিল। মাওলানার চিকিৎসায় জেনেভা থেকে ওষুধ এনেছিলেন—সেই প্রসঙ্গ তুল ধরতে ভোলেননি লেখক। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন ইন্দিরা গান্ধীর বাবা জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে মাওলানা ভাসানীর বন্ধুত্ব বা একধরনের যোগাযোগ ছিল। একাত্তরে ইন্দিরা গান্ধী সেই সম্পর্ককে সম্মান দেখিয়েছেন আন্তরিকতার সঙ্গে।

ছোট্ট এই পরিসরে বইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একমুখী, এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইতিহাস ও বিশ্লেষণ পড়ে যাঁরা ক্লান্ত, তাঁদের জন্য বইটি হতে পারে বিশেষ সহায়। বলতে পারেন একপশলা মুক্ত হাওয়ার মতো। এ বইয়ে পাঠক মুক্তিযুদ্ধের এক ভিন্ন ও নির্মোহ বর্ণনা পাবেন। যার মাধ্যমে সেই সময়ের জটিল সব সমীকরণ বিশ্লেষণ সম্ভব। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও মুজিবনগর সরকারের নানা ঘটনা সম্পর্কে পাঠক নতুন করে চিন্তার সুযোগ পাবেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মঈদুল হাসানের মূলধারা ’৭১ একটি অনন্য গ্রন্থ। ধারণা করি, আধেয় ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সাইফুল ইসলামের স্বাধীনতা ভারত ভাসানী ভবিষ্যতে মূলধারা ’৭১–এর মতো পাঠকনন্দিত ও গ্রহণযোগ্য পুস্তক হিসেবে বিবেচিত হবে।


বাংলাদেশ ও বিশ্বের সকল খবর, ব্রেকিং নিউজ, লাইভ নিউজ, রাজনীতি, বাণিজ্য, খেলা, বিনোদনসহ সকল সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে পড়তে ক্লিক করুন নিউজসেলবিডি ডট কম।

  • গোপনীয়তার নীতি
  • শর্তাবলি
  • মন্তব্য প্রকাশের নীতিমালা
  • বিজ্ঞাপন
  • যোগাযোগ
  • ছুটির তালিকা
  • দিবস

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম রনি

  • ফোন : 01700000000
  • ফ্যাক্স : 01700000000
  • ই-মেইল: info@newscellbd.com
  • বিজ্ঞাপন বিভাগ: ad@newscellbd.com

logo

সোশ্যাল মিডিয়া

logologologologologo
logo

নিউজলেটার

logo

মোবাইল অ্যাপস

অ্যান্ড্রয়েড

আইফোন

স্বত্ব © ২০২৫-২০২৬ নিউজ সেল

ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।