
ভারতের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি দরকার। দেশটি কম দামে সেই জ্বালানি কিনতে চায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কও ধরে রাখতে চায় ভারত। কিন্তু জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা চলছে। তাই এ দুই দিক সামলানো ভারতের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন একটি নিষেধাজ্ঞা আইন হয়েছে। গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ আইনে সই করেছেন। আইনটি তাঁকে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। এতে বলা আছে, যেসব দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি কেনে, সেসব দেশের পণ্যে তিনি ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসাতে পারবেন।
ইউক্রেনে যুদ্ধ চালাতে রাশিয়ার বিপুল অর্থ দরকার। তেল ও জ্বালানি পণ্য বিক্রি করে দেশটি সেই অর্থের বড় অংশ আয় করে। মস্কোর এ আয় বন্ধ করাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের লক্ষ্য।
শুল্ক কখন ও কীভাবে আরোপ করা হবে, তা অনেকটাই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর কবে শুল্ক বসাবেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তিনি আদৌ এ শুল্ক আরোপ করবেন কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। শুল্ক আরোপ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।
ভারত নতুন আইনটিকে হুমকি হিসেবে দেখছে। দিল্লির ভাষ্য, আইনটি ভারতের ওপর ট্রাম্পের চাপ দেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। অথচ একই সময়ে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তির সম্ভাবনা খুঁজছেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন কঠিন অবস্থায় পড়েছেন। ভারত তাঁর প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করে। ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। তাই রুশ জ্বালানি তেলের ওপর ভারতের নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
কেপলার বিশ্বজুড়ে জাহাজ চলাচলের তথ্য সংগ্রহ করে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, চলতি গ্রীষ্মে ভারতের আমদানি করা জ্বালানি তেলের প্রায় অর্ধেক এসেছে রাশিয়া থেকে।
যুক্তরাষ্ট্র বারবার রুশ তেল নিয়ে নীতি বদলেছে। কাজেই প্রতিবারই ভারতকেও তেল কেনার পরিকল্পনা আর কৌশল বদলাতে হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি বাণিজ্যচুক্তি করেছিল। সেটি ছিল গত ফেব্রুয়ারির ঘটনা। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমাতে রাজি হয়েছিল। বিনিময়ে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাতে রাজি ছিল।
এরপর খুব দ্রুত পরিস্থিতি বদলে যায়। চুক্তিটির পেছনে যেসব ধারণা কাজ করেছিল, সেগুলো আর ঠিকঠাক থাকেনি।
ভারতের সঙ্গে দর-কষাকষির সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর শুল্ক আরোপের ক্ষমতা ব্যবহার করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর সেই ক্ষমতা সীমিত করে দেন। এর মধ্যেই ইরান যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ভারতসহ কয়েকটি দেশকে রাশিয়া থেকে বেশি তেল কেনার অনুমতি দেয়। উদ্দেশ্য ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ঘাটতি পূরণ করা।
এখন যুক্তরাষ্ট্র আবার ভারতকে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। কারণ, ভারত অনেক বেশি রুশ তেল কিনছে। কিন্তু এ তেলের বিকল্প খুঁজে পাওয়াটাও এখন কঠিন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি বাণিজ্য চুক্তি করেছিল। সেটি ছিল ফেব্রুয়ারির ঘটনা। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমাতে রাজি হয়। বিনিময়ে রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাতে রাজি হয় ভারত।
ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া
ভারত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক হুমকির কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ।
ভারতের জ্বালানি মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, বাজারের অবস্থা অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি তেল কেনা হবে। ভারত জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার কাজ চালিয়ে যাবে।
ভারত সতর্ক করে বলেছে, নতুন মার্কিন আইনের প্রভাব শুধু দুই দেশের সম্পর্কের ওপরই পড়বে না। প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
ভারত আগেও এমন সমস্যায় পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এক সময় ভারতকে ভেনেজুয়েলা ও ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধে চাপ দিয়েছিল। পরে ওই দুই দেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বদলে যায়। কূটনৈতিক সম্পর্ক ও জ্বালানির দাম বদলে যাওয়ার কারণে মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন এসেছিল।
ভারতকে দুটি জরুরি বিষয় একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখা। দ্বিতীয়ত, নিজেদের জন্য যথেষ্ট জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং সেটা বেশ কম দামে।
এ কারণে ভারতকে দুটি জরুরি বিষয় একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে চায় দিল্লি। দ্বিতীয়ত, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটি নিজেদের জন্য যথেষ্ট জ্বালানি নিশ্চিত করতে চায় এবং সেটা বেশ কম দামে।
বিষয়টি আরও জটিল করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। ভারত অন্য দেশ থেকে জ্বালানি কিনলে যুক্তরাষ্ট্র শাস্তির হুমকি দিচ্ছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ভারত অভ্যন্তরীণ চাহিদার রান্নার গ্যাসের ৮ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করত। এখন এ হার ৫০ শতাংশের বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের দাম বাড়বে
ভারতের সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা ও নয়াদিল্লির গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের পরিচালক অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে ভারতের অতিরিক্ত চিন্তা করা উচিত নয়।
শুল্কের কারণে ভারতের কিছু রপ্তানিকারক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রেই পণ্যের দাম বাড়বে, বলেন এ বিশ্লেষক।
শ্রীবাস্তবের মতে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আগের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত করেছিলেন। এতে তাঁর দর-কষাকষির ক্ষমতা কমেছিল। নতুন আইন তাঁকে সেই ক্ষমতার কিছুটা ফিরিয়ে দিয়েছে।
আপনি কি যুক্তরাষ্ট্রের কড়াই থেকে লাফ দিয়ে চীনের আগুনে পড়তে চান?—
সি রাজা মোহন, জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক
ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তিটি এখনো ঝুলে আছে। তবে নতুন আইনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভারতকে দেওয়ার মতো বড় একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমাতে পারে।
শ্রীবাস্তব বলেন, সমস্যা হলো, বাণিজ্যচুক্তি সই করলেই এসব ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না।
ভারত দেখেছে, যুক্তরাষ্ট্র বড় বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে চুক্তি করেছে। কিন্তু পরে আবার শুল্ক ও চুক্তির শর্ত নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। তাই নতুন আইনটি শুধু ভারতকেই ভাবাচ্ছে না। অন্য দেশগুলোও বোঝার চেষ্টা করছে, আইনটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে কীভাবে প্রভাব ফেলবে।

(বাঁ থেকে) রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে, সেপ্টেম্বর ২০২৬, ছবি: রয়টার্স
প্রসঙ্গ যখন চীন
রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের চেয়ে বেশি তেল কেনে চীন। নতুন আইনটি চীনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ভারতের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁদের প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর যে চাপ দিচ্ছে, চীনের ওপরও কি একই চাপ দেবে।
প্রশ্নটি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভারত বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছে। চীনের শক্তি মোকাবিলার কৌশল হিসেবেই ভারত এটি করেছে।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন হয়েছে। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যোগ দেন চীনের নেতা সি চিন পিং আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিন নেতা একসঙ্গে ছবি তোলেন। এটি ছিল পশ্চিমাদের বাইরের দেশগুলোর সহযোগিতার স্পষ্ট প্রদর্শন।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে সি চিন পিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা।
আশঙ্কা ও চুক্তি
ব্রিকসের বড় দেশগুলোর মধ্যে ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার শক্তিশালী কৌশলগত কারণ রয়েছে। জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সি রাজা মোহন বলেন, ভারতকে দুটি অস্বস্তিকর বিকল্পের একটি বেছে নিতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘আপনি কি যুক্তরাষ্ট্রের কড়াই থেকে লাফ দিয়ে চীনের আগুনে পড়তে চান?’ চীনের শক্তি বাড়ছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার বড় কারণ রয়েছে ভারতের। কিন্তু জ্বালানি ও বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বারবার দাবি বদলাচ্ছে। এতে নয়াদিল্লিতে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতা হলেও সেটি কত দিন টিকবে?
এ বিষয়ে অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি স্থির না হওয়া পর্যন্ত ভারতের কোনো চুক্তি করা উচিত হবে না।

ক্যারিবীয় সাগরে একটি নৌযানে হামলা চালিয়ে চারজনকে হত্যা করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। গত শনিবার তারা এই হামলা চালায়। নৌযানটি মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক বাহিনীর সাউদার্ন কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, নৌযানটি যে সরাসরি মাদক পাচারে যুক্ত ছিল, সে ব্যাপারে তাদের কাছে নিশ্চিত গোয়েন্দা তথ্য ছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন যাদের ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তাদের বিরুদ্ধেই মূলত এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। গত বছর থেকে শুরু হওয়া সেই ধারাবাহিক অভিযানেরই সর্বশেষ নজির এই হামলা। মার্কিন সামরিক বাহিনী আরও জানিয়েছে, শনিবারের এই ঘোষণার ঠিক ১০ দিন আগেও তারা ক্যারিবীয় অঞ্চলে আরেকটি হামলা চালিয়েছিল। ওই হামলায় তিনজন নিহত হন।
অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে বিভিন্ন নৌযানে হামলা চালিয়ে ২২০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই হামলাগুলোকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

ইরানে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থায় অসন্তোষ থেকে সৃষ্ট বিক্ষোভ চলছেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ জনে। দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ গতকাল শনিবার বিক্ষোভ দমনে আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) গতকাল সতর্ক করে বলেছে, দেশের নিরাপত্তা রক্ষাই তাদের জন্য ‘শেষ কথা’। বিদ্যমান পরিস্থিতি আর কোনোভাবেই চলতে পারে না। আর সেনাবাহিনী বলেছে, সরকারি সম্পদ সুরক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক এ বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার যখন তৎপরতা বাড়িয়েছে, তখন আইআরজিসি ও সেনাবাহিনীর তরফে এ বক্তব্য এল।
এর আগে গত শুক্রবার ইরানের নেতাদের আবার সতর্ক করে দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গতকাল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাহসী জনগণের পাশে আছে।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম জানায়, রাজধানী তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে একটি পৌর ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার জন্য ‘দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে বিক্ষোভে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজার দৃশ্য দেখানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিরাজ, কোম ও হামেদান শহরে বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর এসব সদস্য নিহত হয়েছেন।
মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক দুরবস্থার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক রূপ লাভ করে। গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত দেশটির বড় অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনের অবসান দাবি করছেন। অবশ্য ইরানি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এসব ‘দাঙ্গা’ উসকে দিচ্ছে।
এদিকে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহর (মোহাম্মদ রেজা পাহলভি) ছেলে রেজা পাহলভি বিদেশ থেকে বিক্ষোভে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছেন।
ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একজন চিকিৎসক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, শুক্রবার থেকে আহত অনেক বিক্ষোভকারীকে হাসপাতালে আনা হচ্ছে। কারও মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে। কারও হাত-পা ভাঙা। আবার কারও শরীরে গভীর ক্ষত রয়েছে। একটি হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ অন্তত ২০ জনকে আনা হয়েছিল। পরে তাঁদের মধ্যে পাঁচজন মারা যান।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির জনসংযোগ দপ্তর জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় গাচসারানে ‘সশস্ত্র দাঙ্গাবাজদের’ সঙ্গে সংঘর্ষে বসিজ বাহিনীর তিন সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পাঁচজন। পশ্চিমাঞ্চলীয় হামেদানে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। উত্তর-পূর্বের মাশহাদের আহমদাবাদ এলাকায় নিহত হয়েছেন এক ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের ছেলে। গত দুই রাতে খুজেস্তানের শুশতার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্য নিহত হয়েছেন।
ইরানের মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত তারা ৬৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫০ জন বিক্ষোভকারী, ১৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
<div class="ytp-cued-thumbnail-overlay-image" style="background-image: url("https://i.ytimg.com/vi/FoyassBHUm0/sd2.jpg?sqp=-oaymwEoCIAFEOAD8quKqQMcGADwAQH4AbYIgAKAD4oCDAgAEAEYfyBZKC4wDw==&rs=AOn4CLB8aKXI7zDXf-OquyxHZwrK2QaaYA");"></div>
ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ (ব্ল্যাকআউট) রেখেছে। এ কারণে অনেক তথ্যই বহির্বিশ্বে পৌঁছাচ্ছে না।
দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের একজন বাসিন্দা টেলিফোনে রয়টার্সকে জানান, তাঁদের এলাকায় আইআরজিসির সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁরা গুলি চালাচ্ছেন। নিরাপত্তার কারণে ওই ব্যক্তি তাঁর পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, গত দুই রাতে ‘সন্ত্রাসীরা’ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এতে কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। আগুন দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনায়।
আইআরজিসির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অর্জন রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের জন্য ‘শেষ কথা’ (রেড লাইন)। বর্তমান পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর সেনাবাহিনী জানায়, তারা ‘জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত অবকাঠামো ও সরকারি সম্পদের সুরক্ষা’ দেবে।
আইআরজিসির বাইরে পৃথক কাঠামোয় পরিচালিত হয় সেনাবাহিনী। এই বাহিনীও দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া সর্বশেষ বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রেজা পাহলভি বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এখন আর শুধু রাস্তায় নামা নয়, শহরগুলোর কেন্দ্রস্থল দখল ও ধরে রাখার প্রস্তুতি নিতে হবে।’ তিনি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত, বিশেষ করে পরিবহন, তেল, গ্যাস ও জ্বালানি খাতের শ্রমিক ও কর্মচারীদের দেশব্যাপী ধর্মঘটে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আপাতত পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহী নন। এতে ইঙ্গিত স্পষ্ট যে সংকট কোন দিকে যায়, তা দেখেই তিনি বিরোধী নেতৃত্বের বিষয়ে অবস্থান নেবেন।
এর আগে গত সপ্তাহে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে। শুক্রবার তিনি আরও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘তোমরা যদি গুলি চালাও, আমরাও গুলি চালাব।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমি শুধু চাই, ইরানের বিক্ষোভকারীরা নিরাপদ থাকুক। পরিস্থিতি এখন খুবই বিপজ্জনক।’
রাজপথে কিছু বিক্ষোভকারী অবশ্য পাহলভির পক্ষে স্লোগান দিয়েছেন। ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোক’—এমন স্লোগানও শোনা গেছে। তবে অধিকাংশ স্লোগানে বর্তমান সরকারের শাসনের অবসান এবং অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের দাবি তোলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরানের অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় দেশটির অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানজুড়ে গতকাল শনিবার রাতেও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষও হয়েছে। গত তিন দিনে দুপক্ষের সংঘর্ষে কয়েক শ বিক্ষোভকারী নিহত বা আহত হয়েছেন বলে খবর প্রকাশ পেয়েছে।
এদিকে গতকাল বিক্ষোভকারীদের হুঁশিয়ার করে ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ বলেছেন, ‘যাঁরা বিক্ষোভ করছেন, তাঁদের আল্লাহর শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।’
ইরানে এ অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে আইনত মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর দুই সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলছে। আন্দোলন শুরু হয়েছিল মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে, কিন্তু দ্রুতই তা রাজনৈতিক রূপ নেয়। প্রতিবাদকারীদের কেউ কেউ এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র শেষ করার ডাক দিচ্ছেন।
তেহরানের চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে শনিবার মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে বলা হয়েছে, রাজধানীর মাত্র ছয়টি হাসপাতালে অন্তত ২১৭ বিক্ষোভকারীর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এসব হাসপাতালে যাঁদের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের বেশির ভাগই গুলিবিদ্ধ ছিলেন। হাসপাতালগুলোতে হতাহত ব্যক্তিদের ভিড় উপচে পড়ছে।
ইরানে চলমান বিক্ষোভ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল পশ্চিম লন্ডনে ইরানের দূতাবাস প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ হয়েছে। এদিন কয়েক শ বিক্ষোভকারী দূতাবাস ভবনের বাইরে জড়ো হন। তাঁদের হাতে ছিল ইরানের পতাকা। তাঁরা সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়েছেন। এ সময় একজন দূতাবাস ভবনের বারান্দায় উঠে ইরানের পতাকা নামিয়ে ফেলেন।
লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ বলেছে, প্রতিবাদের সময় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনুপ্রবেশের অভিযোগে কর্মকর্তারা অন্য একজনকে খুঁজছেন।

নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া ব্যক্তি তাঁর পুরস্কারটি আরেকজনকে হস্তান্তর, ভাগাভাগি কিংবা প্রত্যাহার করতে পারেন না। ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী কোরিনা মাচাদো ২০২৫ সালে পাওয়া তাঁর পুরস্কারটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দিয়ে দিতে পারেন বলে ইঙ্গিত দেওয়ার পর নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউট এ কথা বলেছে। নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউট শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ীর নাম ঘোষণা করে থাকে।
এক বিবৃতিতে নোবেল ফাউন্ডেশনের বিধিবিধানের কথা উল্লেখ করে ইনস্টিটিউট বলেছে, নোবেল পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও স্থায়ী। এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের কোনো সুযোগ নেই। সংস্থাটি আরও বলেছে, পুরস্কার দেওয়ার পর বিজয়ীদের কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড নিয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো মন্তব্য করে না।
বাংলাদেশ ও বিশ্বের সকল খবর, ব্রেকিং নিউজ, লাইভ নিউজ, রাজনীতি, বাণিজ্য, খেলা, বিনোদনসহ সকল সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে পড়তে ক্লিক করুন নিউজসেলবিডি ডট কম।
স্বত্ব © ২০২৫-২০২৬ নিউজ সেল
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।