
‘ডালিমকুমার’ গল্প কে শোনেনি? রূপকথার গল্পটির লেখক কবি জসীমউদ্দীন। জসীমউদ্দীন আমাদের বেশ কিছু শিশুতোষ লেখা উপহার দিয়েছেন। কিছু ছড়া ও কিশোর কবিতা তো এখনো মুখে মুখে বলে থাকি। আবার আমাদের অনেকে তুমুল জনপ্রিয় ছড়া-কবিতাটি যে জসীমউদ্দীনের তা জানি না! আজ শিশুতোষ এমন কিছু ছড়া ও কবিতা নিয়ে আলোচনা করব।
জসীমউদ্দীনের ‘হাসু’ চমৎকার একটি শিশুতোষ কাব্য। শিশুমনকে নাড়া দেওয়ার মতো অনেক ছড়া আছে এ গ্রন্থে। ‘আমার বাড়ী’ ছড়াংশ: ‘‘আমার বাড়ী যাইও ভ্রমর বসতে দেব পিঁড়ে”। আবার ‘খোকার আকাক্ষ্মা’র মতো নীতিশিক্ষার ছড়া-কবিতাও রয়েছে। এ কবিতা থেকে দুছত্রÑ‘সবার সুখে হাসব আমি/ কাঁদবো সবার দুঃখে’। ‘রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও’Ñ‘‘আসমানী’’ কবিতায় এ চরণটি সবার পড়া ও জানা। ‘এক পয়সার বাঁশী’ জসীমউদ্দীনের দ্বিতীয় শিশুতোষ কাব্যের বই। এখানে ‘এক পয়সার বাঁশী’, ‘হাসুমিয়ার চিঠি’, ‘মা ও খোকা’, ‘আসমানী’, ‘হাসুমিয়ার পাখীস্থান’, ‘গল্পবুড়ো’ শিরোনামীয় বেশ কিছু ছড়া/কবিতা রয়েছে। জসীমউদ্দীনের শিশুতোষ গল্প হচ্ছে, ‘ডালিমকুমার’। এটিও আমাদের কাছে সম্যক পরিচিত। আর একটি মজার গল্পগ্রন্থ হচ্ছে, ‘বাঙালির হাসির গল্প’। উল্লেখিত দুটি গল্পগ্রন্থে শিশুমনের অনেক খোরাকের জোগাড় হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের আঞ্চলিক ও লোকমুখে প্রচলিত কথা নিয়ে মজার মজার গল্প সাজিয়েছেন তিনি। ‘হাসু’ ও ‘এক পয়সার বাঁশি’ দুটি শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ। কাব্যগ্রন্থের বেশির ভাগ কবিতায় তোমাদের মতো করে লেখা। একটু নাহয় পড়েই দ্যাখো-
(১) ‘এই খুকীটির সঙ্গে আমার আলাপ যদি হয়,/সাগর-পারের ঝিনুক হয়ে ভাসবো সাগরময়;/রঙ্গীন পাখীর পালক হয়ে ঝরবো বালুর চরে,/শঙ্খমোতির মালা হয়ে দুলব ঢেউ এর পরে।/তবে আমি ছড়ার সুরে ছড়িয়ে যাব বায়,/তবে আমি মালা হয়ে জড়াব তার গায়’-(আলাপ, হাসু)
(২) ‘এই খুকিটির সঙ্গে তোমার আলাপ যদি থাকে,/বলো যেন আসমানীদের বারেক কাছে ডাকে’-(খোসমানী)
(৩) ‘খুকুমণি! লক্ষ্মীমণি! তোমায় আমি চাঁদ বলিব,/সন্ধ্যা মেঘের টুকরো ছিঁড়ে তোমার দুটো পায় দলিব’-(কবি ও চাষার মেয়ে, এক পয়সার বাঁশী)
(৪) ‘এত হাসি কোথায় পেলে/ কথার খলখলানি /কে দিয়েছে মুখটি ভরে/কোন বা গাঙের কলকলানি।/কে দিয়েছে রঙিন ঠোঁটে/কলমী ফুলের গুলগুলানি।/কে দিয়েছে চলন বলন/কোন সে লতার দোল দুলানী।’- (এত হাসি কোথায় পেলে)
ফুটবল খেলোয়াড় ইমদাদ হকের কথা কিন্তু ছোট্টবেলাতেই শুনেছি। কবি জসীমউদ্দীনের ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ কবিতা থেকে- ‘আমাদের মেসে ইমদাদ হক ফুটবল খেলোয়াড়,/হাতে পায়ে মুখে শত আঘাতের ক্ষতে খ্যাতি লেখা তার।/সন্ধ্যাবেলায় দেখিবে তাহারে পটি বাঁধি পায়ে হাতে,/মালিশ মাখিছে প্রতি গিঁটে গিঁটে কাত হয়ে বিছানাতে।/মেসের চাকর হয় লবেজান সেঁক দিতে ভাঙা হাড়ে,/সারা রাত শুধু ছটফট করে কেঁদে কেঁদে ডাক ছাড়ে।/বাঁ পায়ে বল ড্রিবলিং করে ডান পায়ে মারে ঠেলা,/ভাঙা কয়খানা হাতে পায়ে তার বজ্র করিছে খেলা।/চালাও চালাও আরো আগে যাও বাতাসের আগে ধাও,/মারো জোরে মারো-গোলের ভিতরে বলেরে ছুঁড়িয়া দাও।’
বিন্নি ও শালি ধানের নাম আমরা শুনেছি, তাই না? নবান্নের সময় এসবের কদর ছিল আগেরকার সময়। এসবের খবর কিন্তু কবি জসীমউদ্দীনের কবিতা থেকেই বেশি শুনেছি আমরা। আরও শুনেছি মৌরীখেতে লুটপুটি খেলা-
(১) ‘আমার বাড়ি যাইও ভোমর,/বসতে দেব পিঁড়ে,/জলপান যে করতে দেব/শালি ধানের চিঁড়ে।/শালি ধানের চিঁড়ে দেব,/বিন্নি ধানের খই,/বাড়ির গাছের কবরী কলা/গামছাবাঁধা দই’-(আমার বাড়ি)
(২) ‘চির বিরিঞ্চির গাছে রে ভাই লাল টুকটুক টিয়া,/বসে আছে মৌরী-ফুলের ছাতি মাথায় দিয়া’-(আবল তাবল, এক পয়সার বাঁশী)
কবি জসীমউদ্দীনের মানবিক সত্তাও ফুটে উঠেছে শিশুতোষ ছড়া ও কবিতায়। আবার ব্যথাতুর হয়েছে এতিম শিশুর শোকে-
(১) ‘সবার সুখে হাসব আমি/কাঁদব সবার দুখে,/নিজের খাবার বিলিয়ে দেব/অনাহারীর মুখে’-(সবার সুখে)
(২) ‘কোথায় আমার রাজার কুমার, শুয়ে মায়ের কোলে/তোমার কি ঘুম ভাঙবে না এইশিশুর চোখের জলে’-(পূর্ণিমা)। এতিম শিশুর জন্য ব্যথাতুর কবি। হৃদয়ে শোক এনে দাগ কেটে দেয় কবিতাটি।
(৩) ‘রাখাল ছেলে! রাখাল ছেলে! বারেক ফিরে চাও, / বাঁকা গাঁয়ের পথটি বেয়ে কোথায় চলে যাও?/ ওই যে দেখ নীল-নোয়ান সবুজ ঘেরা গাঁ / কলার পাতা দোলায় চামর শিশির ধোয়ায় পা; / সেথায় আছে ছোট্ট কুটির সোনার পাতায় ছাওয়া,/ সেই ঘরেতে একলা বসে ডাকছে আমার মা / সেথায় যাব, ও ভাই এবার আমায় ছাড় না!’-(রাখাল ছেলে)
(৫) ‘আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,/ রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।/ বাড়িতো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,/ একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।/ একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,/ তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।/... পেটটি তাহার দুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,/ বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর’-(আসমানী)। এ কবিতায় গ্রামের গরীব ও হতভাগ্যের কথা তুলে ধরেছেন কবি। এ কবিতাটিও আমরা প্রায়ই পড়ে থাকি এখনো।
তোমাদের মতোই ছোট্ট মেয়ে হাসু। এই হাসু নিয়েই কবি লিখলেন ‘হাসু’ কবিতা। ‘হাসু একটি ছোট্ট মেয়ে এদের মতো : ‘তাদের মতো,/হেথায় হোথায় ছড়িয়ে আছে খোকা-খুকু যেমনি শত।/নয় তো সে চাঁদের চাঁদকুমারী তারার মালা গলায় পরে/চালায় না সে চাঁদের তরী সারাটা রাত গগন ভরে.../তবু তারে ভালোই লাগে চাঁদের দেশের চাঁদের মেয়ে/শঙ্খমালা, কঙ্খমালা, রঙ্গমালা সবার চেয়ে।’
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মাসি, কেমিস্ট্রি, বায়োকেমিস্ট্রি, মাইক্রোবায়োলজি, বায়োটেক ইত্যাদি কোর সাবজেক্টে পড়ে সরকারি চাকরি আর উচ্চশিক্ষায় বিদেশে যাওয়ার পরেই বড় একটি সুযোগ্য খাত রয়েছে, আর সেটা হলো ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে চাকরি। ৯৮ ভাগ ওষুধের জোগানদাতা এই খাত অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। কিন্তু সদ্য পাস করা একজন শিক্ষার্থীর কাছে কেন প্রথম সারির ক্যারিয়ার গড়ার সিঁড়ি হয়ে উঠছে না, সেটা অবশ্যই ভাবনার বিষয়।
বলাবাহুল্য, ভবিষ্যতের ফার্মা লিডার তৈরি না করলে অপার এই সম্ভাবনার দ্বার দক্ষ আর দায়িত্ববান লিডার ছাড়া অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে যাবে। সরকারি চাকরি না পেয়ে একান্তই বাধ্য হয়ে অনেকেই ঢুকছেন, কাজ করতে গিয়ে বারবার হোঁচট খাচ্ছেন, কাজে মনোনিবেশের তুলনায় কোম্পানির সুযোগসুবিধা আর নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে ভাবতে দিন চলে যাচ্ছে।
ফার্মা মাইক্রোবায়োলজিস্ট নিয়ে এবার যাত্রা শুরু করছে ‘ফার্মা মাইক্রোবায়োলজিস্ট ফোরাম ইন বাংলাদেশ’। দেশের সব ফার্মায় কর্মরত ফার্মা মাইক্রোবায়োলজিস্টদের ভালো-মন্দ, চাকরির সন্ধান, নবীনদের ক্যারিয়ার গঠনে সহায়তা, চাকরিহীনদের চাকরির ব্যবস্থা করা, গাইডলাইনভিত্তিক আলোচনা ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করার অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এই ফোরাম। ফার্মা মাইক্রোবায়োলজিস্ট নিয়ে কোনো স্বতন্ত্র সংগঠন এখনো আলোর মুখ দেখেনি, তাই অনেকটাই আশার আলো নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এই ফোরাম।
এবার আসা যাক মূল বিষয়বস্তুতে। ঈদের ৭-৮ দিনের বন্ধে সব ওষুধ উৎপাদন, ওষুধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম তো বন্ধ হওয়ার কথা, সেটাই স্বাভাবিক। যেমন একটা ইনজেকশন বা চোখের ড্রপ/মলম জীবাণু (ব্যাকটেরিয়া/ছত্রাক) আছে কি না, সেটা পরীক্ষা করতে কমপক্ষে ১৪ দিন লাগে, আর এই ১৪ দিনের প্রতিদিন দক্ষ ওষুধশিল্পের কর্মীরা প্রতিদিন ভালোভাবে মনিটরিং করে দেখেন। একবার ভাবুন তো, ছুটির এই ৭-৮ দিন যদি চেক না হয়, তাহলে ঈদের পরপরই ওই ওষুধ কীভাবে বাজারজাত হবে! তাই প্রতিদিন একইভাবে ডিউটি করে গেছেন ওষুধশিল্পের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা। এই ডিউটিগুলো হয় একদম স্বতঃস্ফূর্তভাবে। একইভাবে একটা ওষুধ কারখানার পানি, বাতাস, গ্যাস প্রতিনিয়ত মনিটরিং করে গেছেন সেই নিবেদিতপ্রাণ। সঙ্গে তো নিরাপত্তাকর্মীরা রয়েছেন সব সেক্টরের মতো। সীমিত আকারে ওষুধ উৎপাদন তো সঙ্গে আছেই। ঈদের পর অফিস খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সব ওষুধের ব্যাচ নিয়মতান্ত্রিকভাবে বাজারে সরবরাহ করা হয়। এই কাজগুলো করবেন ডিস্ট্রিবিউশন-মার্কেটিং-সেলসের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা। দেশের মানুষের স্বাস্থ্য খাতে পরোক্ষভাবে বিশাল অবদান রেখে যাচ্ছেন তারা।
আগের লেখায় বলেছি, ওষুধশিল্পের কর্মীদের অবদান নিয়ে মিডিয়া কভারেজ কম হয়, লেখালেখি কম হয়। সেটা নিয়ে তাদের কোনো আক্ষেপ বা অভিযোগ নেই। তবে একদম না জানলেও সমস্যা, কারণ আমরা অনেকেই ওষুধশিল্পের কর্মীদের পরিবহনকৃত সুন্দর এসি গাড়ি, জীবনযাপন আর দোকানে ওষুধের দাম দেখে তাদের বিলাসী হিসেবেই মূল্যায়ন করি। অনেকেই জানেন না, ওষুধের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে এই জব কখনোই সার্থক হয় না।
ভবিষ্যৎ ফার্মা লিডার তৈরি করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। দেশের মেধা সঠিকভাবে কাজে না লাগালে খুব বেশিদিন নেই যখন দেশের বাইরে থেকে মানুষ আনতে হবে ওষুধের ফর্মুলেশন, উৎপাদন, গুণগতমান নির্ণয় আর নিশ্চিত করতে।
কাজ করতে গিয়ে যদি সারা দিন এই ভেবে দিন যায় যে, কোথায় এলাম, কী হবে আমার ভবিষ্যৎ, আর কেনই–বা এলাম, পরবর্তী সময়ে কোন সেক্টরে যাব ইত্যাদি ইত্যাদি, তাহলে কিন্তু কোথাও না কোথাও ভুল হতেই থাকবে। রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরিরত প্রতিষ্ঠান, কর্মী আর সিনিয়র সবাইকেই এই দায়িত্ব নিয়ে ভবিষ্যৎ লিডার আর দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতেই হবে। কারণ, হতাশাগ্রস্ত কর্মী দিয়ে সুদূরপ্রসারী আশাবাঞ্জক কিছু সম্ভব নয়।
বর্তমান নতুন প্রজন্মের কাছে ফার্মা সেক্টর চাকরির জন্য অবশ্যই গর্বের আর মানবসেবার অন্যতম পরোক্ষ মাধ্যম। আর এই গর্বিত সেক্টরে সিনিয়রদের মতোই নিজের পুরোটা ঢেলে না দিতে পারলে অনেকটাই অপূর্ণ, অনিরাপদ আর ভারসাম্যহীন হয়ে যেতে পারে।
*লেখক: মনোজিৎ কুমার রায়, ফার্মা প্রফেশনাল
নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল:ns@prothomalo.com

আমাদের সমাজে শিক্ষা ও সাফল্যের সম্পর্ক নিয়ে একধরনের সরল বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। ভালো শিক্ষা মানেই ভালো ভবিষ্যৎ, ভালো ডিগ্রি মানেই নেতৃত্বের যোগ্যতা এই ধারণা এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে আমরা প্রায় ভুলেই যাই, জীবন সব সময় এই সরল সূত্র মেনে চলে না। বিশেষ করে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার মতো ক্ষেত্রে এই ধারণা বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। খালেদা জিয়ার জীবন সেই চ্যালেঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রথাগত শিক্ষায় সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনিবার্য চরিত্র হয়ে উঠলেন, সেই প্রশ্ন আমাদের শিক্ষা, নেতৃত্ব ও সফলতার সংজ্ঞা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
খালেদা জিয়ার প্রথাগত শিক্ষাজীবন দীর্ঘ বা উচ্চতর ছিল না। তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ একাডেমিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেননি, রাজনৈতিক দর্শন বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক পাঠও তার জীবনের অংশ ছিল না। এই বাস্তবতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বহুবার আলোচনায় এসেছে, অনেক সময় তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরা এ বিষয়ে বিদ্রূপের সঙ্গে সমালোচনা করত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সীমিত প্রথাগত শিক্ষা তাঁকে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা, পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা, রাজপথে থেকে তিনি শিখেছেন গণমুখী শিক্ষার পাঠ এবং দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা তাঁকে একজন শক্ত অবস্থানের রাজনৈতিক নেত্রীতে পরিণত করেছে।
খালেদা জিয়ার জীবনের প্রথম অধ্যায় ছিল নিভৃত, ব্যক্তিগত এবং গৃহকেন্দ্রিক। একজন গৃহিণী হিসেবে তাঁর জীবন আবর্তিত হতো পরিবারকে ঘিরে। সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার কাছাকাছি ছিলেন, কিন্তু সক্রিয় রাজনীতির মঞ্চে থাকার কোনো প্রস্তুতি তখনো তাঁর ছিল না।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল:ns@prothomalo.com
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়ার সামনে এক গভীর সংকটের সময় আসে। একদিকে ব্যক্তিগত শোক, অন্যদিকে একটি রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ ও একটি দেশের অস্থির সময় এই তিনের সম্মিলন তাঁকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি কোনো সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ার উদ্দেশ্যে। বরং সময়, বাস্তবতা ও দায়িত্ববোধ তাঁকে এই কঠিন দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য করেছে। এই জায়গাতেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় রূপান্তরটি ঘটে।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। রাজপথের আন্দোলন সংগঠিত করা, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দমনমূলক বাস্তবতার ভেতর টিকে থাকা সহজ কাজ ছিল না। এখানে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তাঁকে পথ দেখায়নি। পথ দেখিয়েছে অভিজ্ঞতা, ভুল থেকে শেখা এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা। রাজনীতি থেকে রাজনীতি শেখার এই প্রক্রিয়াই তাঁকে ধীরে ধীরে একজন পরিণত রাজনৈতিক নেত্রীতে রূপান্তরিত করে।
১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনকারী বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনা ছিল জটিল ও সংবেদনশীল কাজ। তাঁর শাসনামল নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে, যা গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে অবস্থান করেছেন। ক্ষমতায় থাকুন কিংবা বিরোধী দলে, তিনি রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে ছিলেন না। এই ধারাবাহিক উপস্থিতি একজন নেতার বড় শক্তি, যা কেবল প্রথাগত শিক্ষা দিয়ে অর্জন করা যায় না।
লেখক:মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান, পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ এক সময় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী পাসপোর্টধারী দেশগুলোর একটি ছিল। এই শতাব্দীর শুরুতেও অনেক দেশেই বাংলাদেশিদের প্রতি একধরনের ইতিবাচক মনোভাব ছিল। ভ্রমণ ও ব্যবসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকেরা তুলনামূলক সহজেই অনেক দেশে প্রবেশ করতে পারতেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান ক্রমাগত নিম্নগামী। হেনলি পাসপোর্ট সূচক অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের সারিতেই ঘোরাফেরা করছে। প্রশ্ন হলো—কেন এই পতন? কেন বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে, সীমান্তে বা বিমানবন্দরে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর একপাক্ষিক নয়। দায় জনগণেরও আছে, আবার রাষ্ট্র ও সরকারেরও আছে। একদিকে নাগরিকদের সচেতনতা ও নৈতিকতার ঘাটতি; অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থা, দুর্নীতি ও নীতিনির্ধারণে ব্যর্থতা—দুই মিলে আমাদের পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মানকে ক্রমে দুর্বল করে দিয়েছে।
জনগণের দায়: আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্মান নষ্ট করছি—
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ, যেখানে বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে। কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, দারিদ্র্য, এবং উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা বহু মানুষকে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই বিদেশগমন অবৈধ পথে হয়; কেউ কেউ সমুদ্রপথে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করে, কেউ আবার ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরে আসে না বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে আশ্রয় (Asylum) প্রার্থনা করে।
প্রতিবছরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসে ভূমধ্যসাগরে ডুবে বহু বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, কিংবা অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকালে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এসব মানুষ দালালের প্রলোভনে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নেন, কিন্তু অধিকাংশ সময় তাঁদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইউরোপে পৌঁছানো অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা শীর্ষ দশের মধ্যে রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলে ‘অবৈধ অভিবাসী-উৎস দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই ধরনের অবৈধ অভিবাসন বহির্বিশ্বে বাংলাদেশকে এমন একটি দেশ হিসেবে উপস্থাপন করে, যেখানে নাগরিকরা দারিদ্র্য ও বেকারত্বে অতিষ্ঠ হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দেশ ছেড়ে পালাতে চায়।
বাংলাদেশ থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালিতে অবৈধ অভিবাসনের প্রসঙ্গ টেনে ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো সম্প্রতি বলেছেন, ২০২৫ সালে ১৮ হাজারের বেশি বাংলাদেশি নৌকায় লিবিয়া হয়ে ইতালি পৌঁছেছেন এবং আশ্রয় চেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যদি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি অবৈধভাবে বিদেশ যান এবং বিদেশে আশ্রয় প্রার্থনার যে প্রক্রিয়া আছে, তার অপব্যবহার করেন, তবে তা পাসপোর্টের সূচকে প্রভাব ফেলে’ (প্রথম আলো, ১৪ নভেম্বর ২০২৫)। বিবিসি বাংলা অনলাইনে ১৬ নভেম্বর প্রকাশিত একটি রিপোর্টেও বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান কমে যাওয়া ও বাংলাদেশিদের ভিসা না দেওয়ার কারণ হিসেবে এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এ ছাড়া রিপোর্টে আরও বলা হয়, ‘ভিসার অপব্যবহার করে বাংলাদেশিদের একদেশ থেকে অন্যদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে কমেছে বিশ্বাসযোগ্যতা। এ ছাড়া দেশের বাইরে রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের প্রকাশ্য বিবাদে জড়ানোর কারণেও নষ্ট হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি।’
অনেক বাংলাদেশি পর্যটক ভিসা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে যায়; কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষে দেশে ফিরে আসে না। বরং তারা অবৈধভাবে থেকে কাজ করে, যা ভিসার শর্তভঙ্গ। এই অপব্যবহারের কারণে অনেক দেশ বাংলাদেশি নাগরিকদের পর্যটক ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কূটনৈতিকভাবে দেখা যায়, যেসব দেশের নাগরিকরা বারবার ভিসার নিয়ম লঙ্ঘন করে, সেই দেশগুলোর জন্য পরবর্তী সময়ে ভিসা প্রাপ্তির শর্ত কঠোর হয়।
বেশ কিছু বাংলাদেশি বিদেশে গিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাজনৈতিক নির্যাতন, ধর্মীয় বৈষম্য বা প্রাণনাশের হুমকির শিকার বলে আশ্রয়ের আবেদন করে। ইউরোপ, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে এ ধরনের আবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ আবেদনই ভিত্তিহীন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন দপ্তরগুলোর প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, ভিত্তিহীন হওয়ায় বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের একটি বড় অংশের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। এই মিথ্যা আশ্রয় আবেদন শুধু ব্যক্তির নয়, গোটা দেশের ভাবমূর্তির ওপর আঘাত হানে।
বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকেই বৈধ ভিসা নিয়ে বিদেশে গিয়ে নিয়ম ভেঙে অবস্থান করেন, কেউ কেউ পাসপোর্ট ফেলে দিয়ে অবৈধ হয়ে যান। কিছু প্রবাসী শিক্ষার্থী ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও দেশে ফেরেন না। এইসব নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে ভিসা নীতিতে। অনেক দেশ বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত নথিপত্র, সাক্ষাৎকার বা দীর্ঘ যাচাই প্রক্রিয়া চালু করেছে। যেসব শিক্ষার্থী বা পর্যটক বৈধভাবে বিদেশ যেতে চান, তাঁদেরও বারবার সন্দেহের মুখে পড়তে হয়। এভাবে কয়েকজনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের দায় বহন করতে হচ্ছে সমগ্র জাতিকে।
অনেক নাগরিক মৌলিক অভিবাসন আইন, ভিসার শর্ত বা গন্তব্য দেশের শ্রমনীতি সম্পর্কে জানেন না। আবার ব্যবসায়ীরা ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। অনেকেই দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট বা ভিসা নেন, জানেন না কীভাবে আইনত বৈধভাবে বিদেশে কাজ করতে হয়। ফলে বিদেশে গিয়ে সমস্যায় পড়েন, গ্রেপ্তার হন, দেশে ফেরত আসেন, আর আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের নাম কালোতালিকায় উঠে আসে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com
তা ছাড়া বহু বাংলাদেশি প্রবাসে যাওয়ার সময় বা বিশেষ করে দেশে ফেরার সময় অনাবশ্যক ও অবৈধ মালামাল বহন করেন। যেমন সীমার বাইরে সোনা, মুদ্রা, কিংবা নিষিদ্ধ পণ্য। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এর প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। বিদেশের ইমিগ্রেশন অফিসারেরা জানেন, কিছু বাংলাদেশি যাত্রী নিয়ম মানেন না। ফলে পুরো জাতি ‘রিস্কি ট্রাভেলার’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। অনেকে আবার বিদেশে গিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতি, আইনকানুন ও সামাজিক শিষ্টাচার মানেন না, যা বাংলাদেশের নাগরিকদের ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষুণ্ন করে।
তবে সবকিছুর মুলে রয়েছে আমাদের অশিক্ষা, সুশিক্ষার অভাব, ও নৈতিক অবক্ষয়। আমাদের সমাজে অনেকের কাছে শিক্ষা মানে কেবল সার্টিফিকেট অর্জন। আমরা শিক্ষিত হলেও বাস্তবে সুশিক্ষিত নই, এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে কেউ কেউ নিজের দেশের মর্যাদাকে ব্যক্তিগত লাভের কাছে বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে না। বিমানবন্দরে ঘুষ, কাস্টমসে প্রতারণা, বিদেশে বেআইনি কাজ—সবই এই মানসিকতার প্রতিফলন। এই নৈতিক অবক্ষয় কিছু প্রবাসী বাংলাদেশিদের আচরণেও প্রতিফলিত হয়, যা পুরো জাতির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। যেমন, বিদেশে প্রবাসী শ্রমিকদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ঘটনা দেশের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রভাবিত করে। কারণ মিডিয়া ও কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো এসব তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেয়।
রাষ্ট্র ও সরকারের দায়: কাঠামোগত ব্যর্থতা ও নীতি সংকট
বাংলাদেশের অভিবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরে দালালনির্ভর। বিদেশে কাজে পাঠানোর নামে বহু মানুষ প্রতারণার শিকার হন, জাল কাগজে কাজের ভিসা পান, পরে বিদেশে গিয়ে বিপাকে পড়েন। দালাল বা অবৈধ এজেন্টদের কারণে বৈধ প্রক্রিয়া ভেঙে যায়। প্রবাসী শ্রমিকেরা কখনো কখনো নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত তদারকি বা আইনি সহায়তার অভাব এই সমস্যাকে আরও প্রকট করেছে। ফলে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর আস্থা রাখতে পারে না। কিছু দেশ এমনকি বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধও করে দেয়। বিদেশি রাষ্ট্রগুলো এই ধরনের পরিস্থিতি দেখে বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতি গ্রহণ করে।
আমাদের যুবসমাজের একটি বড় অংশ বাধ্য হয়ে বিদেশে কাজ খুঁজতে যায়; কারণ, দেশে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ নেই। ফলে অনেকেই যেকোনো উপায়ে বিদেশ যেতে চান, বৈধ বা অবৈধভাবে। রাষ্ট্রের ব্যর্থ অর্থনৈতিক নীতি ও বেকারত্বের সংকটই তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দেয়। যদি দেশে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হতো, তাহলে নাগরিকরা মরিয়া হয়ে বিদেশে অবৈধ পথে যাওয়ার চেষ্টা করতেন না।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও বিদেশে কর্মসংস্থান বা আন্তর্জাতিক নাগরিকত্বের চেতনাবিষয়ক কোনো বাস্তবধর্মী শিক্ষা নেই। ভাষা, সংস্কৃতি, আইন, প্রযুক্তি—এসব বিষয়ে তরুণদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। ফলে বিদেশে গিয়ে তারা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে বা সমস্যায় জড়ায়। রাষ্ট্র যদি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারত, তাহলে বিদেশে আমাদের নাগরিকদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত এবং পাসপোর্টের মানও উন্নত হতো।
তা ছাড়া পাসপোর্ট অফিস থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত দুর্নীতির প্রভাব স্পষ্ট। কেউ ঘুষ দিয়ে জাল নথিতে পাসপোর্ট পেয়ে যায়, আবার প্রকৃত নাগরিককে পেতে হয় ভোগান্তি। এমনকি কখনো দেখা যায় অপরাধী বা ভুয়া পরিচয়ে কেউ বিদেশে গিয়ে অপরাধ করে, ফলে পুরো দেশই সন্দেহের তালিকায় পড়ে। রাষ্ট্র যদি প্রশাসনিক সততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারত, তাহলে পাসপোর্টের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়ত।
একটি দেশের পাসপোর্টের মান কেবল নাগরিকদের আচরণে নয়, সেই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বৈদেশিক নীতির শক্তির ওপরও নির্ভর করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বল্পমেয়াদি। বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজ-বিল্ডিং বা নাগরিক অধিকার রক্ষায় দূতাবাসগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখে না। যেসব দেশে বাংলাদেশিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ হয়, সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিবাদ বা আলোচনার উদ্যোগ খুবই সীমিত। এই নিস্ক্রিয় কূটনীতি আমাদের পাসপোর্টকে দুর্বল করে তুলছে।
আরও পড়ুন
মরক্কো ও মিসর: জ্ঞান, সংস্কৃতি ও স্বাদের ভ্রমণ–প্রথম পর্ব
১৬ নভেম্বর ২০২৫
মরক্কো ও মিসর: জ্ঞান, সংস্কৃতি ও স্বাদের ভ্রমণ–প্রথম পর্ব
সামগ্রিক দায়: জাতি হিসেবে কোথায় ভুল করছি
বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান কমে যাওয়া কোনো একদিনের ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘ সামাজিক, নৈতিক ও প্রশাসনিক অবক্ষয়ের ফল। আমরা এমন এক সমাজে পরিণত হয়েছি, যেখানে আইন মানা নয়, বরং আইন ফাঁকি দেওয়াকে বুদ্ধিমত্তা মনে করা হয়। যেখানে শিক্ষা মানে চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা, মানুষ হওয়া নয়। আমরা সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত হলেও, প্রকৃত অর্থে কুশিক্ষিত। রাষ্ট্রও সেই কুশিক্ষার ফল ভোগ করছে। নীতিনির্ধারণে দূরদর্শিতার অভাব, প্রশাসনে জবাবদিহির অভাব, নাগরিক সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগের অভাব—সব মিলে এক দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে।
করণীয়: দায় স্বীকার ও সম্মিলিত উদ্যোগ
বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী ও মেধাবী—এই পরিচয়েই বিশ্বে আমাদের আসল মর্যাদা। কিন্তু কিছু নাগরিকের অবৈধ বিদেশগমন, ভিসার অপব্যবহার ও মিথ্যা আশ্রয় আবেদন দেশের ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করছে, পাসপোর্টের মান কমাচ্ছে। সরকার, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সকল অনৈতিক ও বেআইনি প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে বিদেশগামী নাগরিকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, আইন ও সংস্কৃতিবিষয়ক ওরিয়েন্টেশন, এবং অভিবাসনসংক্রান্ত মৌলিক শিক্ষা দেওয়া দরকার। অভিবাসন খাতে দালালতন্ত্র নির্মূল, পাসপোর্ট ইস্যুতে কঠোর যাচাই-বাছাই, এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠন করতে হবে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে নাগরিক নৈতিকতা, বৈশ্বিক নাগরিকত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যুবসমাজকে বিদেশ-নির্ভর না করে দেশে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি সম্পর্কে স্কুল ও কলেজ এবং ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা চালানো প্রয়োজন, যাতে মানুষ বুঝতে পারে দালালের মিথ্যা প্রলোভন কতটা ভয়াবহ হতে পারে। যেকোনো ধরনের ভিসা-অপব্যবহার বা জালিয়াতির ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দালাল ও মানবপাচারকারীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় ও দায়বদ্ধ করতে হবে। মিথ্যা আশ্রয় আবেদন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং বৈধ অভিবাসনের ইতিবাচক দিকগুলো প্রচার করতে হবে। সর্বোপরি শিক্ষার মান, নাগরিক সচেতনতা, নৈতিক শিক্ষা, প্রশাসনিক দক্ষতা, ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধির পাশাপাশি সব আইনভঙ্গকারীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যেদিন আমরা আইনকে মান্যতা দেব, সততা ও শিক্ষা দিয়ে নিজেদের গড়ে তুলব, সেদিন পৃথিবী আমাদের পাসপোর্টকে সম্মানের চোখে দেখবে।
*লেখক: কাজী ফরিদ, অধ্যাপক ও অভিবাসন গবেষক, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ছিল গতকাল শুক্রবার। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের নানা খবর ছড়িয়ে পড়া ও জালিয়াতির ঘটনায় আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সারা দেশে শতাধিক জালিয়াতি চক্রের সদস্য ও অসাধু পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। সব দিক নির্মোহভাবে বিবেচনা করলে এটা বললে অত্যুক্তি হবে না, এবারের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশে সরকারি নিয়োগব্যবস্থার অন্যতম নেতিবাচক অধ্যায়।
১৪ হাজারের বেশি পদের বিশাল এই নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের ঘটনা এ দেশের লাখো বেকার তরুণের স্বপ্নকে নির্মমভাবে চূর্ণ করেছে। যাদের কাছে এই পরীক্ষা ছিল জীবনের মোড় ঘোরানোর একমাত্র সুযোগ, তাদের কাছে এটি এখন রাষ্ট্রীয় অবহেলার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও যখন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়, তখন মেধা, শ্রম ও সততার কোনো মূল্য থাকে না।
জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং স্বৈরাচার পতনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী তরুণেরা। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে তাঁরা একটি ন্যায্য, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এসে সেই তরুণ সমাজই আজ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। রাষ্ট্র সংস্কারের বড় বড় বুলি শোনা গেলেও বেকার সমাজের দুর্দশা লাঘবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করে দিয়েছে, বিদ্যমান নিয়োগব্যবস্থা পুরোপুরি পচে গেছে। নিয়োগপদ্ধতির আমূল সংস্কার না করে একের পর এক পরীক্ষা আয়োজন মানেই চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে নির্মম তামাশা করা। প্রশ্ন থেকে শুরু করে পরীক্ষাকেন্দ্র, সবখানেই দুর্নীতির জাল এতটাই বিস্তৃত যে সাধারণ মেধাবীদের জন্য সেখানে জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ঘটনায় প্রশ্ন উঠতেই পারে, এত তাড়াহুড়া করে পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন কী ছিল? যেখানে প্রতিবছর তিন ধাপে সুশৃঙ্খলভাবে পরীক্ষার আয়োজন করা হতো, সেখানে এবার কেন এক ধাপে পরীক্ষা নিয়ে দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়া হলো? এই তাড়াহুড়ার পেছনে কারা লাভবান হলো, সেই প্রশ্নের জবাব কি কেউ দেবে?
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল:ns@prothomalo.com
একটি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস, ডিভাইস পার্টি, প্রক্সি পরীক্ষার্থী, শিক্ষকদের অনৈতিক সহযোগিতা ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব এত সহজে কাজ করতে পারে, তাহলে সেই দেশে মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে কথা বলা কি নিছক ভণ্ডামি নয়? এতদিন পর্দার আড়ালে কী পরিমাণ জালিয়াতি হয়েছে, তা কল্পনা করলেই সৎ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের গা শিউরে ওঠে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলার দায় কে নেবে? বছরের পর বছর রক্ত জল করা পরিশ্রম কি শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল চোরদের পকেটেই যাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়ে রাষ্ট্র যদি আবারও নির্বিকার থাকে, তবে তরুণ সমাজের হতাশা আরও বাড়বে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হয়নি, নিয়োগবাণিজ্যও থামেনি। আমরা এমন একটি সরকার আশা করেছিলাম, যারা ক্ষমতায় বসেই পুরোনো দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো ভেঙে ফেলবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা চাকরিপ্রত্যাশীরা তা পেলাম না।
এই দেশে দুই হাজার নয়, দুই কোটি মানুষ জীবন বিসর্জন দিলেও দুর্নীতি কমবে না, যদি সিস্টেমের পরিবর্তন না ঘটে। তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় দাবি ছিল এই সিস্টেম পরিবর্তন। সেই দাবি উপেক্ষা করলে রাষ্ট্র একদিন তাদের আস্থাও হারাবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় এড়ানোর একমাত্র পথ হলো, এই নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করা এবং সম্পূর্ণ সংস্কারকৃত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় নতুন করে পরীক্ষার আয়োজন করা। অন্যথায় এই অন্যায়ের দায় ইতিহাস ক্ষমা করবে না।
বাংলাদেশ ও বিশ্বের সকল খবর, ব্রেকিং নিউজ, লাইভ নিউজ, রাজনীতি, বাণিজ্য, খেলা, বিনোদনসহ সকল সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে পড়তে ক্লিক করুন নিউজসেলবিডি ডট কম।
স্বত্ব © ২০২৫-২০২৬ নিউজ সেল
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।