আপডেট :

'মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম মজুরি বৃদ্ধি, সংসারের ব্যয় মেটাতে ঋণনির্ভর বহু পরিবার'
মাসের শুরুতে বেতন হাতে পেলেও মাস শেষ হওয়ার আগেই অর্থসংকটে পড়ছেন অনেক চাকরিজীবী। বাসাভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল এবং পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে মাসের শেষ দিনগুলো পার করতে কেউ কেউ ধারদেনার আশ্রয় নিচ্ছেন, আবার অনেকে কমিয়ে দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় খরচ।
রোববার (২৫ অক্টোবর) প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর এক প্রতিবেদনে ঢাকার কয়েকজন বেতনভোগী মানুষের আর্থিক সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় অনেকের জন্য নিয়মিত সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি কারও কারও দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতেও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বেতনের বড় অংশ চলে যাচ্ছে সংসারের খরচে
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদনে আনাস আহমেদের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। মাসে ৫৪ হাজার টাকা আয় করেও তাঁকে সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাসাভাড়া, ইউটিলিটি বিল, যাতায়াত, বাজার ও কিস্তি পরিশোধের মতো খরচ মেটানোর পর হাতে খুব বেশি অর্থ অবশিষ্ট থাকছে না। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অনেক সময় মাসের ২৫ তারিখের মধ্যেই তাঁর হাতে থাকা টাকা শেষ হয়ে যায়। ফলে বাকি দিনগুলোর খরচ চালাতে ঋণ নিতে হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে এক মাসের ব্যয় মেটাতে নেওয়া ঋণ পরবর্তী মাসের বেতন থেকে পরিশোধ করতে হয়। এতে নতুন মাসের বাজেটেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। একপর্যায়ে এক মাসের ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে পরবর্তী মাসেও একই আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে পারেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মূল্যস্ফীতির তুলনায় পিছিয়ে মজুরি বৃদ্ধি
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের বরাত দিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আগের মাস আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।
অন্যদিকে, একই সময়ে জাতীয় পর্যায়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০ দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কম ছিল।
এই ব্যবধানের অর্থ, গড় হিসাবে মজুরি যে হারে বাড়ছিল, তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছিল পণ্য ও সেবার দাম। ফলে আয় বাড়লেও সেই আয় দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনার সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এখানে উল্লেখ্য, মূল্যস্ফীতির হার বাড়া মানে সাধারণভাবে দাম বৃদ্ধির গতি বেড়েছে। আবার মূল্যস্ফীতির হার কমলেও বাজারে পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে আসে না; দাম কমতে হলে পণ্য ও সেবার মূল্যস্তরে প্রকৃত পতন ঘটতে হয়।
জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে ঋণ নিচ্ছে বহু পরিবার
দ্য ডেইলি স্টার-এর ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিবিএসের জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে ঋণ নিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে ঋণ নেওয়া পরিবারের হার গ্রামীণ এলাকায় ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান শুধু বেতনভোগী চাকরিজীবীদের আর্থিক পরিস্থিতি নির্দেশ করে না; বরং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর ক্ষেত্রে ঋণনির্ভরতার একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে।
শুধু খরচ কমিয়ে কি আর্থিক সংকট সামলানো সম্ভব?
ব্যক্তিগত বাজেট তৈরি, আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সঞ্চয়ের পরিকল্পনা আর্থিক চাপ সামলাতে সহায়ক হতে পারে। তবে যেসব পরিবারের আয়ের প্রায় পুরোটাই খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যয় হয়ে যায়, তাদের পক্ষে শুধু খরচ কমিয়ে সঞ্চয় করা সব সময় সম্ভব হয় না।
এ অবস্থায় জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়, নিয়মিত ও ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধি এবং পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মাস শেষ হওয়ার আগেই বেতন ফুরিয়ে যাওয়া এবং সংসারের ব্যয় মেটাতে ধারদেনার ওপর নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে পরিবারের সঞ্চয়, আর্থিক নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই এ পরিস্থিতিকে কেবল ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে না দেখে আয়, ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতার সামগ্রিক সম্পর্কের আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: ১. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড — ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ২. দ্য ডেইলি স্টার — ১৮ অক্টোবর ২০২৬। ৩. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) — সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির তথ্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত জরিপ; সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী।
প্রতিবেদক: পি.এইচ.এম. সাখাওয়াত
সাভার, ঢাকা।
বাংলাদেশ ও বিশ্বের সকল খবর, ব্রেকিং নিউজ, লাইভ নিউজ, রাজনীতি, বাণিজ্য, খেলা, বিনোদনসহ সকল সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে পড়তে ক্লিক করুন নিউজসেলবিডি ডট কম।
স্বত্ব © ২০২৫-২০২৬ নিউজ সেল
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।