logo
menu

ইউরোপ কি পারবে ট্রাম্পের থাবা থেকে গ্রিনল্যান্ডকে বাঁচাতে

ইউরোপ কি পারবে ট্রাম্পের থাবা থেকে গ্রিনল্যান্ডকে বাঁচাতে

ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখল পরিকল্পনা। বিশ্বরাজনীতিতে নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কোনো কিছুর প্রতিবাদ না করাই যেন ইউরোপীয় রাজনীতির রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এ মুহূর্তে গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক উত্তেজনার নতুন স্তরে নিয়ে গিয়েছে।

হেলসিঙ্কি জিও-ইকোনমিকস সোসাইটির মহাসচিব ও হার্ভার্ডের অধ্যাপক জেন্স হিলেব্রান্ড পোহলের মতে, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কখনই চাপ সৃষ্টি করতে পারে না। ইউরোপ যেন ‘দন্তহীন কাগুজে বাঘ’। আর জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমেয়ার বলেছেন, বিশ্ব যেন লুটেরাদের আড্ডায় পরিণত না হয়। ভেনেজুয়েলার প্রসঙ্গ সরাসরি না তুললেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মূল্যবোধ ভঙ্গের অভিযোগ এনেছেন।


ডেনমার্কের গণমাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মার্কিন নাগরিকদের গোপনে প্রভাব তৈরির অভিযানের খবর প্রকাশের পর গত বছরের আগস্টেই রাজধানী কোপেনহেগেনে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিককে তলব করা হয়েছিল। ড্যানিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স ল্যোক্কে রাসমুসেন তখন বলেছিলেন, ‘আমরা বন্ধুদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করি না।’ ড্যানিশ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো বন্ধুদেশের হস্তক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে তিনি আখ্যা দিয়েছিলেন।

ড্যানিশ সম্প্রচারমাধ্যম ডিআরের তথ্য অনুযায়ী মার্কিন সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত তিনজন মার্কিন নাগরিক গ্রিনল্যান্ডে নানা গুপ্তচরমূলক কার্যক্রম চালিয়েছেন। অভিযোগ আছে, তাঁদের একজন গ্রিনল্যান্ডবাসীদের তালিকা করেছেন, কে মার্কিন প্রভাব সমর্থন করেন আর কে মার্কিনদের সমালোচক। ড্যানিশ গোয়েন্দা সংস্থা পিইটি সতর্ক করে বলেছিল, গ্রিনল্যান্ড ‘বিভিন্ন ধরনের প্রভাব বিস্তারের ও অভিযানের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে’।

গ্রিনল্যান্ডে নবনিযুক্ত মার্কিন বিশেষ দূত, লুইজিয়ানার গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রি যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম সিএনবিসিকে জানান, ‘প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কসহ একটি স্বাধীন গ্রিনল্যান্ডকে সমর্থন করেন।’ এ বিষয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের সম্মতি ট্রাম্পের দরকার নেই বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

সামরিক দখল প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ল্যান্ড্রি বলেছিলেন, ‘না, আমি তা মনে করি না।’ তবে ট্রাম্পের উপপ্রধান চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক লড়াই করবে না।’ উল্লিখিত নানা তথ্য থেকে বোঝা যায়, গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন আগ্রাসনের ছক অনেক আগে থেকেই পরিকল্পিত।

৫৭ হাজার জনসংখ্যা–অধ্যুষিত দ্বীপদেশ গ্রিনল্যান্ডের আয়তন প্রায় ২২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। রাজধানী শহরের নাম নুক। মূল ভূখণ্ডের ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা স্থায়ীভাবে বরফে ঢাকা।

এমন একটি দ্বীপ দেশ নিয়ে মার্কিনদের কেন এই আগ্রাসী পরিকল্পনা? আর্কটিক এই দ্বীপের কৌশলগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ইতিমধ্যে গ্রিনল্যান্ডের এক ছোট দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং মূল ভূখণ্ডকে সংযুক্তীকরণ ছাড়াও সেগুলো সম্প্রসারণ করা সম্ভব। তাই ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের মূল আগ্রহ গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদের আহরণ।

গ্রিনল্যান্ডে রয়েছে বিপুল খনিজ সম্পদ। এখানে রয়েছে বিরল খনিজ, যা স্মার্টফোনসহ আধুনিক প্রযুক্তি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া তামা, গ্রাফাইট, লিথিয়াম, এমনকি তেল ও গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।

ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার খনিজবিশেষজ্ঞ ইয়াকব ক্লোভে কাইডিং ‘জিও’ ম্যাগাজিনকে জানিয়েছে, ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৩৪টি কাঁচামালের মধ্যে ২৩টিই গ্রিনল্যান্ডে রয়েছে। এ কারণেই ২০২৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে একটি চুক্তি করে, যাতে গ্রিনল্যান্ডের কাঁচামালের কৌশলগত সরবরাহকারী হিসেবে নিশ্চিত করা যায়।

গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত। কোনো আঞ্চলিক সেনা নেই, চারটি পুরোনো নৌযান, একটি কুকুরবাহী-স্লেজ সাগর সীমান্তে টহল দেয়।

ড্যানিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের লিন মর্টেনসগার্ড বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আধা ঘণ্টা বা তারও কম সময়ের মধ্যে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।

ইউরোপিয়ান সংসদের ড্যানিশ সাংসদ স্টিনে বোসে সতর্ক করে বলেছেন, ‘ট্রাম্প কথা বলেন, তারপর তা করে ফেলেন।’ আর আর্কটিক ইনস্টিটিউটের রোমাঁ শুফার্টের মতে, এমন আগ্রাসনের কোনো ‘আইনি ভিত্তি’ নেই এবং এই আগ্রাসন ন্যাটো সামরিক জোটের ‘সমাপ্তি’ ডেকে আনবে।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে ইউরোপের সাতটি বড় দেশ—জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন, যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্ক। একটি যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো উল্লেখ করেছে, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড–সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত নেওয়া একান্তই ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের বিষয়।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জাতিসংঘ সনদে অন্তর্ভুক্ত সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তার নীতির গুরুত্ব জোর দিয়ে উল্লেখ করেছে। এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ড ন্যাটো সামরিক জোটের অংশ বিধায় আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা সম্মিলিতভাবেই নিশ্চিত করার কথা এবং এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টায় ভেঙে যাবে ন্যাটো
১০ জানুয়ারি ২০২৬
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টায় ভেঙে যাবে ন্যাটো
কিন্তু যদি কোনো ন্যাটো সদস্যরাষ্ট্র আরেক সদস্যকে আক্রমণ করে বসে, তাহলে কী হবে? গ্রিনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলের একটি স্বায়ত্তশাসিত এলাকা, যা ডেনমার্কের অন্তর্ভুক্ত। ডেনমার্ক যেমন ন্যাটোর সদস্য, যুক্তরাষ্ট্রও তেমন একটি সদস্য। উত্তর আটলান্টিক চুক্তির অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, কোনো সদস্যরাষ্ট্রে আক্রমণ মানে সব ন্যাটো রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ। তবে জোটের ভেতরে এক সদস্যের দ্বারা আরেক সদস্যের ওপর আক্রমণের কোনো দৃশ্যপট সেখানে নির্ধারিত নেই।

২০২৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, ৮৫ শতাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী চান না যে তাঁদের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হোক। মাত্র ৬ শতাংশ এর পক্ষে রয়েছেন।। তবে একই জরিপে দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ মানুষ ডেনমার্ক থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা চান। ডেনমার্ক অর্থনৈতিক সহায়তা ও সামরিক নিরাপত্তা দিলেও অনেক গ্রিনল্যান্ডবাসী দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেন।


স্বল্পভাষী সজ্জন জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমেয়ারের কথাই হয়তো সত্য। ৮ জানুয়ারি ৭০তম জন্মদিনের এক অনুষ্ঠানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। উল্লেখ করেছেন, বিশ্ব যেন লুটেরাদের আড্ডায় পরিণত না হয়।

তিনি বিশ্বব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান ভাঙনের দিকে নীরব দর্শক হয়ে না থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা ইতিমধ্যেই অনেক দূর এগিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা সংঘটিত ঘটনাগুলো মূল্যবোধের ভঙ্গ বলে তিনি জানান।

হুমকির মুখে সক্রিয় হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করেন স্টাইনমেয়ার। তিনি ব্রাজিল ও ভারতের মতো দেশগুলোকে বিশ্বব্যবস্থা রক্ষায় এগিয়ে আসতে রাজি করাতে হবে বলে জানান। একই সঙ্গে জার্মানিকেও সামরিক শক্তির ওপর জোর দিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এখন দেখার বিষয়, ইউরোপীয় দেশগুলো একটি বিবৃতি দিয়ে দন্তহীন কাগুজে বাঘ হয়ে থাকবে, নাকি বাস্তবতার নিরিখে অন্য সিদ্ধান্ত নেবে।

সরাফ আহমেদ
প্রথম আলোর জার্মান প্রতিনিধি
Sharaf.ahmed@gmx.net
১০ জানুয়ারি ২০২৬

Total Views:

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

1

সাভারে অস্ত্রোপচারে শিশুমৃত্যু: ১০ লাখ টাকায় সমঝোতার খবর, টাকা নেওয়া অস্বীকার মায়ের!

2

তামিল সিনেমায় নতুন ইতিহাস গড়লেন রজনীকান্ত এর ‘জেলার ২’

3

দেনমোহর মাত্র ৯৯৯ টাকা, বিয়ে করলেন অভিনেতা শিমুল

4

অতিথি পাখি রক্ষায় জাবি ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ, জলাশয়ে একাধিক বিধিনিষেধ?

5

মাস শেষের আগেই ফুরিয়ে যাচ্ছে বেতন, ধারদেনায় বাড়ছে চাকরিজীবীদের চাপ!

6

পাঠ্যবইয়ের ছবি নিয়ে বিতর্ক, ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বই থেকে দাঁড়িপাল্লার ছবি বদলের উদ্যোগ।

7

সাভারের সিআরপি ঘিরে বাসাভাড়া ও থেরাপি সেবায় উদ্বেগ! নজরদারি বাড়ানোর দাবি!

8

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চার পাঠ্যবই!

9

১৮ বছরের আগেই বিয়ে ৪৭.২ শতাংশ নারীর! উদ্বেগ জানাল ইউনিসেফ।

10

সাভারে হেযবুত তওহীদের কর্মীসভা অনুষ্ঠিত, প্রধান অতিথি এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম।


বাংলাদেশ ও বিশ্বের সকল খবর, ব্রেকিং নিউজ, লাইভ নিউজ, রাজনীতি, বাণিজ্য, খেলা, বিনোদনসহ সকল সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে পড়তে ক্লিক করুন নিউজসেলবিডি ডট কম।

  • গোপনীয়তার নীতি
  • শর্তাবলি
  • মন্তব্য প্রকাশের নীতিমালা
  • বিজ্ঞাপন
  • যোগাযোগ
  • ছুটির তালিকা
  • দিবস

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম রনি

  • ফোন : 01700000000
  • ফ্যাক্স : 01700000000
  • ই-মেইল: info@newscellbd.com
  • বিজ্ঞাপন বিভাগ: ad@newscellbd.com

logo

সোশ্যাল মিডিয়া

logologologologologo
logo

নিউজলেটার

logo

মোবাইল অ্যাপস

অ্যান্ড্রয়েড

আইফোন

স্বত্ব © ২০২৫-২০২৬ নিউজ সেল

ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।