আপডেট :

প্রায় এক দশক ধরে চীন–জাপান সম্পর্কে অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছিল। সেটি এখন হঠাৎ করেই নতুন এক সংকটের পথে ধাবিত হচ্ছে। সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির একটি মন্তব্য।
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৭ নভেম্বর জাপানের সংসদের নিম্নকক্ষের এক কমিটিতে বক্তব্য দেন তাকাইচি। সেখানে তিনি বলেন, তাইওয়ানে চালানো সামরিক হামলা ‘জাপানের অস্তিত্বের ওপর হুমকি হয়ে দেখা দেওয়া পরিস্থিতি’ তৈরি করতে পারে। এ সময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় এতে জাপানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনারও আভাস দেন তিনি।
জাপানের নতুন এবং প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যকে চীন ১৯৭২ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় ঘোষিত অঙ্গীকার থেকে দেশটির সরে আসার ইঙ্গিত হিসাবে দেখছে। এর জবাবে পাল্টা কিছু পদক্ষেপ বেইজিং গত বছরের নভেম্বর মাস থেকেই নিতে শুরু করে।
চীনের সেসব পদক্ষেপের মধ্যে শুরুতেই ছিল জাপান ভ্রমণে যাওয়া উচিত হবে কি না, তা বিবেচনা করে দেখার জন্য দেশটির নাগরিকদের প্রতি জানানো আহ্বান। জাপানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের দেশটির বৈরী আচরণ সম্পর্কে সাবধান করে দেওয়া। একই সঙ্গে জাপানের জনপ্রিয় কয়েকটি অ্যানিমেশন ছায়াছবির চীনে মুক্তি পাওয়া স্থগিত করা।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। টোকিও, জাপান; ২৫ নভেম্বর, ২০২৫
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। টোকিও, জাপান; ২৫ নভেম্বর, ২০২৫ছবি: রয়টার্স
বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকেরা মনে করেছিলেন, চীনের গ্রহণ করা সেসব পদক্ষেপ জাপানের অর্থনীতির ওপর যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সার্বিক প্রভাবের দিক থেকে সেগুলো যে খুব বেশি ক্ষতিকর ছিল, তা প্রমাণিত হয়নি। চীনা পর্যটকের সংখ্যা যথেষ্ট হ্রাস পেলেও জাপানি মুদ্রা ইয়েনের মূল্য পড়ে যাওয়ায় পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ পশ্চিমের বিভিন্ন দেশ থেকে জাপান ভ্রমণে আসা পর্যটকের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এটি জাপানের পর্যটন ও হোটেল ব্যবসা খাতকে পরিস্থিতি সামাল দিতে তা সাহায্য করেছে।
অবশ্য জাপানের কোনো কোনো মহল বিষয়টিকে ইতিবাচক বলেও গ্রহণ করছে। কারণ, মাত্রাতিরিক্ত পর্যটকের আগমন কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে জাপান যখন ভাবছিল, ওই অবস্থায় চীনের এই সিদ্ধান্ত আসে। এটি অতিরিক্ত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করেই বিদেশ থেকে আসা পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে নিতে জাপানকে সাহায্য করে।
উত্তেজনার পারদ বাড়ছে
চীন অবশ্য শুরুতে গ্রহণ করা সে রকম কয়েকটি পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাপানের ওপর চাপ বৃদ্ধির অন্যান্য প্রচেষ্টা হিসেবে এরপর এসেছে জাপানের সমুদ্রপণ্যের আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনরায় বহাল করা। ২০১১ সালের ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত ফুকুশিমা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি শীতল করার কাজে ব্যবহারের পানি সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। এই বিতর্কের কারণে চীন কয়েক বছর আগে জাপানের সামুদ্রিক পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
জাপান অবশ্য বলে আসছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই হালকা করে নেওয়া সেই পানি বিভিন্ন সময়ে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য সেটা ক্ষতিকর নয়। পরবর্তী সময়ে চীন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও নতুন করে পানি ছেড়ে দেওয়াকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে কিছুদিন আগে আবারও সেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। চীনের পক্ষ থেকে এরপর গ্রহণ করা পদক্ষেপের মধ্যে ছিল জাপানের কয়েকটি চিড়িয়াখানায় প্রদর্শনীর জন্য পাঠানো পান্ডা ফিরিয়ে নেওয়া।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত সেই মন্তব্যের পর থেকেই চীন দাবি করে আসছে, প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি যেন তাঁর মন্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। জাপানের পক্ষ থেকে সে রকম কিছু করা না হলে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ বন্ধ রাখার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করে বেইজিং। দেশটি এখনো সেই অবস্থান ধরে রাখছে।
জাপান অবশ্য তাদের দৃষ্টিতে অযৌক্তিক মনে হওয়া দাবি মেনে না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বলেছেন, চীনের সঙ্গে সংলাপ পুনরায় শুরু করতে তিনি আগ্রহী। এমনকি সোমবার নতুন বছরের প্রথম সংবাদ সম্মেলনেও তিনি বলেছেন, দুই দেশের সামনে দেখা দেওয়া বিভিন্ন উদ্বেগ ও চ্যালেঞ্জের সমাধান করে নিতে যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণে চীনের সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া সংলাপ জাপান আবারও শুরু করতে চাইছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, চীনের সঙ্গে সংলাপের নানা রকম সুযোগ জাপান খোলা রেখেছে এবং সেই দুয়ার কখনো বন্ধ করে দেয়নি।
তাকাইচি হয়তো ভেবে থাকবেন, তাঁর এই বক্তব্যকে দৃঢ় অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে গণ্য করে চীন সম্ভবত জাপানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে সম্মত হবে। তবে চীনের নিজস্ব হিসাব-নিকাশে সে রকম চিন্তাভাবনার সুযোগ যে একেবারেই রাখা হয়নি, জাপানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের সর্বশেষ সংযোজন সম্ভবত তার পরিষ্কার আভাস দিচ্ছে।
চীনের জিয়াংসু প্রদেশের একটি বন্দরে রপ্তানির জন্য বিরল উপাদানসমৃদ্ধ মাটি পরিবহন করছেন শ্রমিকেরা; ৩১ অক্টোবর ২০১০
চীনের জিয়াংসু প্রদেশের একটি বন্দরে রপ্তানির জন্য বিরল উপাদানসমৃদ্ধ মাটি পরিবহন করছেন শ্রমিকেরা; ৩১ অক্টোবর ২০১০ছবি: রয়টার্স
বিরল মৃত্তিকা নিয়ে ‘বাজি’
চীন মঙ্গলবার জাপানে রপ্তানি করা কিছু পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। জাপান সরকারের পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতের কিছু প্রতিষ্ঠানও এতে উদ্বেগ প্রকাশ করে। জাপানের উদ্বেগের প্রধান কারণ হচ্ছে বিরল মৃত্তিকা ধাতু। জাপানের শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টরসহ আরও কিছু অগ্রসর প্রযুক্তিতে এই পণ্যের ব্যবহার। কোন ধরনের সামগ্রী সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবে, চীন অবশ্য সুনির্দিষ্টভাবে সেগুলোর নাম উল্লেখ না করে বলেছে, সামরিক ও বেসামরিক ব্যবহারের সামগ্রী উৎপাদনে যা ব্যবহার করা হয়, সে রকম দ্বৈত ব্যবহারের পণ্য জাপানে রপ্তানিতে বেইজিং নিয়ন্ত্রণ কঠোর করবে।
অন্যদিকে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সতর্ক করে দিয়েছে, বিশ্বের যেকোনো দেশ বা ভূখণ্ডের যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হালনাগাদ করা এই বাণিজ্যনীতি লঙ্ঘন করে জাপানের সামরিক সক্ষমতা জোরদার করায় সহায়তা করছে প্রমাণিত হলে আইনগতভাবে তাদের দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
জাপান মনে করছে, বিরল মৃত্তিকা ধাতু নতুন এই নিষেধাজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত পণ্যের তালিকায় থাকছে। সর্বাধুনিক বিভিন্ন সমরাস্ত্র উৎপাদনে বিরল মৃত্তিকা ধাতুর ব্যবহারকে আবশ্যকীয় হিসেবে দেখা হয়। জাপানের পাশাপাশি পশ্চিমের কিছু দেশও এই পণ্যের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জাপানও চীনের সর্বশেষ এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা থেকে পিছিয়ে থাকেনি।
চীনের নতুন এবং কঠোর রপ্তানিনীতির বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পরপরই জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংবাদমাধ্যমকে জানায়, মন্ত্রণালয়ের এশিয়া এবং ওশেনিয়াবিষয়ক ব্যুরোর প্রধান মাসাআকি কানাই নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবি জানাতে টোকিওর চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ব্যুরোপ্রধান কানাই চীনা দূতাবাসের উপপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেছেন, চীনের এ সিদ্ধান্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নিয়মাবলির বিচ্যুতি এবং জাপানের কাছে তা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জাপানের এতটা উদ্বিগ্ন হওয়ার পেছনে আছে বিরল মৃত্তিকা ধাতুর আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে জাপানের অর্থনীতির ওপর বিশাল যে প্রভাব পড়বে, সেই হিসাব-নিকাশ। বিদ্যুৎ–চালিত মোটরগাড়ি থেকে শুরু করে আধুনিক অস্ত্রব্যবস্থার মতো সব কটি ক্ষেত্রে ব্যবহারের বিরল মৃত্তিকা ধাতুর বৈশ্বিক সরবরাহে চীনের আধিপত্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ফলে চীনের সঙ্গে বৈরী কূটনৈতিক সম্পর্ক চলতে থাকা অবস্থায়ও জাপানের মতো কয়েকটি দেশকে বিরল সেই পণ্যের জন্য চীনের ওপর নির্ভর করতে হয়।
চীনও জাপানের এই নির্ভরশীলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাইওয়ান নিয়ে বেইজিংয়ের ভাষায় ‘অযথা উত্তেজনা সৃষ্টি করার জন্য’ জাপানকে শায়েস্তা করার সর্বশেষ প্রচেষ্টায় এখন এই বিরল ধাতুর শরণাপন্ন হচ্ছে। ফলে উভয় পক্ষ কঠোর অবস্থান ধরে রাখায় কোথায় যে এর সমাপ্তি ঘটবে, তার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থাকে বিশ্বের চলমান সংকটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হতে পারে।
পরিণতি ভয়াবহ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্ভট আচরণ বিশ্বের বিরাজমান সব রকম ব্যবস্থার ওপর কুঠারাঘাত করে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ের বাণিজ্যের প্রচলিত অনেক নিয়মাবলি এখন ভেঙে যাওয়ার পথে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কে এখন কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় কে কতটা মারমুখী হুংকার ছাড়ছে, সেটাও হয়ে উঠেছে যেন দর্শক আকৃষ্ট করা এক সার্কাস। ভানুমতির যে খেলা দেখার জন্য পরোক্ষে বড় অঙ্কের মাশুল দিতে হচ্ছে বিশ্বের তাবত মানুষকে।
এ রকম অবস্থায় আড়ালে চলছে যেন এক সার্বিক যুদ্ধের প্রস্তুতি, যে উন্মাদনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের বিশ্বপরিস্থিতির কথা। একদিকে হিটলারের হুংকারে আতঙ্কিত চারপাশের শান্তিকামী জনপদ, অন্যদিকে আত্মরক্ষার দোহাই দিয়ে সবাই যোগ দিচ্ছে অস্ত্রভান্ডার ভারী করে নেওয়ার প্রতিযোগিতায়। প্রবণতা অনেকটা একই রকম মনে হলেও এবার সে রকম কিছু ঘটে গেলে সমাপ্তি নিশ্চিতভাবেই হবে ভয়াবহ। কেননা মানবপ্রজাতির বিলুপ্তির মধ্যে দিয়েই কেবল সমাপ্তি সূচিত হবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া নতুন সেই যুদ্ধের।
বাংলাদেশ ও বিশ্বের সকল খবর, ব্রেকিং নিউজ, লাইভ নিউজ, রাজনীতি, বাণিজ্য, খেলা, বিনোদনসহ সকল সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে পড়তে ক্লিক করুন নিউজসেলবিডি ডট কম।
স্বত্ব © ২০২৫-২০২৬ নিউজ সেল
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।