আপডেট :

কক্সবাজারের হিমছড়ির একটি রিসোর্টের হলরুম জুড়ে সাজানো ছিল সারি সারি ডেস্ক। সেখানে পাওয়া যায় ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ এবং ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন। এর সঙ্গে ছিল ল্যাপটপ, প্রিন্টার, কি-বোর্ড, মাউস ও কানেকশন বোর্ডসহ নানা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি। রিসোর্টের অন্য একটি অংশে বানানো হয়েছিল ছয়টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ।
মেরিনা বিচ ভিলা নামের এই রিসোর্ট থেকে সম্প্রতি এসব সরঞ্জাম জব্দ করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, পর্যটকদের রাত্রিযাপনের জন্য ব্যবহৃত এই রিসোর্টটির আড়ালেই গোপনে গড়ে তোলা হয়েছিল একটি পূর্ণাঙ্গ কম্পিউটার ল্যাব, যেখান থেকে অনলাইন আর্থিক প্রতারণার (স্ক্যাম) কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
তবে এতগুলো আইফোন ঠিক কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতো, কোন প্ল্যাটফর্মে সেগুলো কাজে লাগানো হয়েছিল, বা এর পেছনে কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জব্দ করা সরঞ্জামের ফরেনসিক পরীক্ষার পরই বিস্তারিত জানা যাবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এই ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার রাতে পাঁচজন চীনা ও একজন তাইওয়ানের নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন শুক্রবার বিকেলে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রামু থানায় দায়ের হওয়া সাইবার সুরক্ষা আইনের একটি মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলায় নাম থাকা আরও চারজন এখনো পলাতক, এবং অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে প্রায় ৩০০ জন চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিককে।
রিসোর্ট দখলে নেওয়ার কৌশল
পুলিশের তথ্যমতে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, তবে তাঁদের অবস্থানের কারণ বা কার্যক্রম সম্পর্কে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা তাঁরা দিতে পারেননি।
এজাহারে বলা হয়েছে, শুধু মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট নয়, উখিয়ার ইনানী এলাকার ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড-ব্লু রিসোর্ট এবং ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের একটি আবাসিক ভবনেও ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিক অবস্থান করছিলেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, চীনা নাগরিক ঝান ইউয়ান ফান বাংলাদেশে ‘বাবর আলী’ নাম ধারণ করে চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে চারটি স্থাপনা ভাড়া নেন। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, এসব স্থাপনা কেবল থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি—বরং আগের ব্যবস্থাপনা বদলে নিজেদের প্রয়োজনমতো নতুন করে সাজানো হয় এবং নিরাপত্তাকর্মীসহ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণও তাঁরা নিজেদের হাতে নিয়ে নেন।
মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের মহাব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, বিদেশি নাগরিকেরা নাম-পরিচয় থেকে শুরু করে রিসোর্ট ভাড়া নেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করেছেন, যা তাঁরা প্রথমে বুঝতেই পারেননি।
কীভাবে ধরা পড়ল চক্রটি
দিনের বেলায় মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের কম্পিউটার ল্যাবে কাজ করতেন চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকেরা, এরপর সন্ধ্যায় চলে যেতেন ড্রিম হলিডে, অর্কিড-ব্লু ও ইলিয়াস ব্রাদার্সের আবাসিক ভবনগুলোতে।
তাঁদের সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ্য করে গত ২৫ আগস্ট পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি দল মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে অভিযান চালায়। তবে অভিযানের খবর আগেভাগে টের পেয়ে অভিযুক্তরা পালিয়ে যান। সেদিনই রিসোর্ট থেকে আইফোন ও কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
জব্দ তালিকা অনুযায়ী পাওয়া যায় ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কি-বোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস এবং ২৪টি কানেকশন বোর্ড। এ ছাড়াও উদ্ধার হয় ১৫টি নোট খাতা, একটি ডায়েরি, চারটি গ্রামীণফোন ও একটি রবি সিম। জব্দ করা এসব মালামাল আপাতত রিসোর্টের মহাব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিকের কাছে হেফাজতে রাখা হয়েছে।
ঘটনার দুই দিন পর, ২৬ আগস্ট, ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রিসোর্টটি পরিদর্শন করে। পুলিশের ভাষ্যমতে, প্রতিনিধিদলটি মৌখিকভাবে জানায়—সংশ্লিষ্ট চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকেরা প্রতারণা ও অনলাইনভিত্তিক অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন।
এরপর ২৮ আগস্ট কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের নয় সদস্যের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যায়। তদন্ত শেষে দলটি পুলিশকে জানায়, অভিযুক্তরা কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, প্রতারণামূলক প্রলোভন, নকল বা ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে অর্থ জমা নেওয়া এবং অর্থ আত্মসাতের মতো সংঘবদ্ধ অনলাইন আর্থিক প্রতারণায় জড়িত থাকতে পারেন।
এত আইফোনের রহস্য নিয়ে প্রশ্ন
এত বিপুলসংখ্যক আইফোন কেন একসঙ্গে মজুত রাখা হয়েছিল, এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই এগোচ্ছে পুলিশের তদন্ত। মামলার বাদী রামু থানার পরিদর্শক মিন্টু দত্ত জানান, ধারণা করা হচ্ছে আইফোনসহ এই সরঞ্জামগুলো প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণামূলক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হতো। তবে ফোনগুলো ঠিক কী কাজে এবং কোন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে ফরেনসিক পরীক্ষার পরই।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরীর মতে, এই ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন আন্তর্জাতিক কোনো অনলাইন প্রতারণা নেটওয়ার্কের অংশ কি না, তা দ্রুত উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ওই কম্পিউটার ল্যাবে ঠিক কী ধরনের কার্যক্রম চলত এবং এর সঙ্গে বৈশ্বিক কোনো প্রতারণা চক্রের সংযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ PM
বাংলাদেশ ও বিশ্বের সকল খবর, ব্রেকিং নিউজ, লাইভ নিউজ, রাজনীতি, বাণিজ্য, খেলা, বিনোদনসহ সকল সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে পড়তে ক্লিক করুন নিউজসেলবিডি ডট কম।
স্বত্ব © ২০২৫-২০২৬ নিউজ সেল
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।